মস্তিষ্কে ‘নিয়ন্ত্রণ’ পদ্ধতি আবিষ্কারের স্বীকৃতি

চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিন নোবেল বিজয়ী
একটি অতি ক্ষুদ্র শৈবাল কীভাবে আলোর উৎস খুঁজে পায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে গবেষণার শুরু, কয়েক দশক পর সেটিই চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার এনে দিল তিন বিজ্ঞানীকে। মানব মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি বোঝার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মানির দুই গবেষক পিটার হেগমান ও গেয়র্গ নাগেল।
গতকাল সোমবার সুইডেনের স্টকহোমে কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি তাদের নাম ঘোষণা করে। মানবমস্তিষ্কের জটিল কার্যপ্রণালি এবং একক স্নায়ুকোষ বা নিউরনের আচরণ নিয়ন্ত্রণের যুগান্তকারী পদ্ধতি অপ্টোজেনেটিকস আবিষ্কারের জন্য তারা এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। ‘অপ্টো’ অর্থ আলো এবং ‘জেনেটিকস’ অর্থ জিনগত প্রযুক্তি। কিন্তু এত বড় ব্যাপারটা আসলে কী? বিষয়টি সহজ করে বোঝা যাক। মানুষের মস্তিষ্কে অসংখ্য স্নায়ুকোষ বা নিউরন রয়েছে। এসব নিউরন বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
ধরুন, একজন মানুষ ভয় পেলেন। তখন মস্তিষ্কের কোন কোষগুলো সক্রিয় হলো? কোন কোষটি ভয় তৈরি করল? কোনটি সেই ভয়কে স্মৃতিতে ধরে রাখল? কোন স্নায়ুকোষের কার্যকলাপের কারণে মানুষটি দৌড়ে পালালেন?
আগে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট নিউরনকে বেছে নিয়ে সেটিকে সরাসরি চালু বা বন্ধ করে দেখে, বোঝা— এই নিউরনটি আসলে কী করছে— তা ছিল অত্যন্ত কঠিন। অপ্টোজেনেটিকস সেই জায়গাতেই বিপ্লব ঘটিয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৯০ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে; এত বিপুলসংখ্যক কোষের মধ্যে নির্দিষ্ট কোষের ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
এই প্রযুক্তিতে নির্দিষ্ট নিউরনকে আলো-সংবেদনশীল করে তোলা যায়। এরপর মস্তিষ্কের সেই নির্দিষ্ট কোষে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ফেললে সেটি সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ গবেষকরা অনেকটা সুইচের মতো করে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে বা বুঝতে পারেন।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে— এ তো মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের মতো অবস্থা! কিন্তু ব্যাপারটা কীভাবে ঘটল, মানে শুরুটা কোত্থেকে? নোবেল প্রাইজের ওয়েবসাইট বলছে, গল্পের শুরুটা একটি ক্ষুদ্র সবুজ শৈবাল থেকে। এতটাই ছোট যে, খালি চোখে তার অস্তিত্বও বোঝা যায় না। কিন্তু সেই ছোট্ট প্রাণীটিকে নিয়ে বিজ্ঞানীর এক কৌতূহল একসময় এমন এক আবিষ্কারের জন্ম দেবে, যা মানুষের মস্তিষ্ক গবেষণার পদ্ধতিই বদলাবে— তা হয়তো কেউ কল্পনা করেনি।
প্রশ্নটি ছিল খুব সাধারণ— একটি এককোষী শৈবাল কীভাবে বুঝতে পারে, কোন দিকে আলো আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু হয়েছিল যে গবেষণা, কয়েক দশক পর সেটিই এনে দিল বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি— নোবেল পুরস্কার।
জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগমান গবেষণাগারে একটি এককোষী সবুজ শৈবাল— ক্ল্যামাইডোমোনাস নিয়ে ভাবছিলেন, ছোট্ট এই শৈবাল আলো শনাক্ত করতে পারে এবং আলোর উৎসের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কীভাবে?
বিজ্ঞানীরা জানতেন, জীবজগতের অনেক প্রাণী ও কোষ আলো অনুভব করতে পারে। কিন্তু ক্ল্যামাইডোমোনাসের ক্ষেত্রে আলো কীভাবে রাসায়নিক বা বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত হয়, সেটি ছিল বড় প্রশ্ন।
এই রহস্যের খোঁজ করতে গিয়ে হেগমান এমন এক বিশেষ প্রোটিনের সন্ধান পান, যা আলো পড়লে কোষের ঝিল্লিতে থাকা আয়ন চ্যানেল খুলে দিতে পারে। পরবর্তী গবেষণায় গেয়র্গ নাগেলের সঙ্গে কাজ করে তারা চ্যানেলরোডপসিন-২-এর মতো আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিনের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করেছেন। আলো পড়লেই এই প্রোটিনের মাধ্যমে আয়নের প্রবাহ তৈরি হতে পারে— অর্থাৎ আলোকে সরাসরি বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করা সম্ভব।



