খামেনির জানাজা ঘিরে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে ভারত!

খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় যোগ দেওয়ার জন্য মোদিকে আমন্ত্রণ নয়াদিল্লির সামনে এনেছে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ- এআই
ইরান তাদের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় যোগ দেওয়ার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আর এই আমন্ত্রণ নয়াদিল্লির সামনে তৈরি করেছে একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হওয়া খামেনিকে তেহরান, কুম এবং ইরাকের কয়েকটি শহরে শোকযাত্রা শেষে মাশহাদে দাফন করা হবে। রাষ্ট্রীয় জানাজার আনুষ্ঠানিকতা ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
ভারত এ আমন্ত্রণে কীভাবে সাড়া দেয়, সেদিকে নজর থাকবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর। জ্বালানি, বাণিজ্য, সংযোগ ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও নয়াদিল্লির কৌশলগত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। ফলে জানাজায় ভারতের প্রতিনিধিত্বের স্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কূটনৈতিকভাবে।
এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে ভারত। ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি নিহত হলে ভারত এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়কে জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে পাঠায়।
তবে খামেনির মৃত্যু বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রথম দিনেই তিনি নিহত হন। হামলার পর প্রথম দিকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে নীরব ছিল। পরে পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি নয়াদিল্লিতে ইরানি দূতাবাসে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি বারবার সংযম, সংলাপ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
খামেনি শুধু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নন, তিনি বিশ্বের শিয়া মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কর্তৃত্বও ছিলেন। ইরানের পর সবচেয়ে বেশি শিয়া মুসলমানের বসবাস ভারতে। ফলে তার জানাজা নয়াদিল্লির জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
কৌশলগত দিক থেকেও ইরান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চাবাহার বন্দর প্রকল্প আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সংযোগ কৌশলের অন্যতম ভিত্তি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা-ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পটির গুরুত্ব কমেনি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসকারী লাখো ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তাও নয়াদিল্লির জন্য বড় বিবেচ্য বিষয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যেমন বেড়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে খামেনির জানাজায় ভারতের উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে বিভিন্ন দেশ।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেল্লানি বলেছেন, এই জানাজা নয়াদিল্লিকে ‘অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনৈতিক অবস্থানে’ ফেলেছে। তার মতে, খামেনির মৃত্যুর পর ভারতের নীরবতার কারণে এক ধরনের ‘কূটনৈতিক দায়’ তৈরি হয়েছে। আবার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানো হলে তা প্রমাণ করবে, ভারতের ইরাননীতি ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের ইচ্ছায় পরিচালিত হয় না, বিশেষ করে চাবাহার বন্দরে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রেক্ষাপটে।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, নির্ধারিত বিদেশ সফরের কারণে প্রধানমন্ত্রী মোদির ইরান সফরের সম্ভাবনা কম। তবে নয়াদিল্লি একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিকে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নেওয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আমন্ত্রণ বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জটিল বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। ভারত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠাক বা অপেক্ষাকৃত নিম্নপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করুক, সেই সিদ্ধান্তে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষার প্রচেষ্টাই প্রতিফলিত হবে।




