হরমুজ ঘিরে নতুন উত্তাপ
ইরানে ‘উন্মাদ’ ট্রাম্প ছাড়ছেন না মিত্রদেরও
- ওমানকে বোমা মারার হুমকি মহড়া বাতিল দক্ষিণ কোরিয়ায়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মুখে বড় বড় বুলি ফুটলেও ভেতর ভেতর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বমোড়লের রাশভারি কূটনীতি ভুলে রীতিমতো ছেলেমানুষি শুরু করে দিয়েছেন ট্রাম্প। ‘বড় হামলা’র বাঘের হুঙ্কার ছেড়ে পরক্ষণেই আবার হাঁটছেন আলোচনার পথে। লেজ গুটিয়ে নিচ্ছেন বিড়ালের মতো! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যুদ্ধে নেমে পাঁচ মাসেই দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ট্রাম্প। গতকালও নিজেই তার প্রমাণ দিলেন আরও একবার। মেজাজ হারিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র ওমানকেই বোমা হামলার হুমকি দিয়ে বসলেন উন্মাদের মতো! এখানেই শেষ নয়, একই দিনে যৌথ সামরিক মহড়া বাতিল করলেন ৭০ বছরের বন্ধুরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও। কারণ একটাই— ইরান!
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে ওমানেও বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ওমান যদি এই প্রক্রিয়ায় ‘বাধা’ হয়ে দাঁড়ায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেবে। দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী ওমানকে লক্ষ্য করে এমন ভাষা উপসাগরীয় কূটনীতিতে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের হুমকি এসেছে এমন সময়ে, যখন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ইরান ও ওমানের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, জাহাজ চলাচলের রুট নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে এবং এখন যৌথ বিবৃতির খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি অন্তর্বর্তী সময়ে জাহাজগুলো ইরানের কাছের একটি পথ দিয়ে প্রবেশ এবং ওমানের কাছের একটি পথ দিয়ে বের হতে পারে; তখন কোনো টোল বা বাধ্যতামূলক ফি থাকবে না।
হরমুজ বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনি। যুদ্ধের আগে বিশ্বে সমুদ্রপথে বেচাকেনা হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যেত। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রণালিটির বাণিজ্যিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ইরান কার্যত পথটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলো ঘিরে নৌ-অবরোধ জোরদার করে।
ওমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুই দেশ তৃতীয় কৌশলগত সংলাপ করেছে, যেখানে নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ফেব্রুয়ারিতেও মাস্কাট মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদলের পৃথক বৈঠক আয়োজন করে। তাই ট্রাম্পের বর্তমান হুমকি কূটনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। কারণ, ওমান ঐতিহ্যগতভাবে সংঘাত কমানোর সেতু হিসেবেই পরিচিত।
একই ইস্যুতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় গতকাল ভোররাতে নিজের ট্রুথ সোশ্যালে এই আদেশ দেন তিনি। ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, ‘উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের সঙ্গে আমার অত্যন্ত ভালো সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমি মোটেও খুশি নই যে, যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।’ তিনি যোগ করেন, ‘এই মহড়াগুলোর বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হয় (যেমনটা সচরাচর হয়ে থাকে) এগুলো শুধু ব্যয়বহুলই নয় বরং এগুলো এমন একটি দেশের প্রতি সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ও বৈরী বার্তা দেয়, যে দেশটি ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কোনো হুমকি সৃষ্টি করেনি এবং সর্বদা শ্রদ্ধাশীল আচরণ করেছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রায়ই যৌথ সামরিক মহড়া আয়োজন করে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়াতেই যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি ‘ক্যাম্প হামফ্রিজ’ অবস্থিত। সেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা সদস্য, তাদের পরিবার এবং কোরীয় নাগরিকরা অবস্থান করেন। এই সামরিক মহড়াটি সাজানো হয়েছে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবিকাশমান সক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে। এতে ড্রোন, জিপিএস ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ও সাইবার হামলার মোকাবিলা করার মতো প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে গত সপ্তাহে একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স। ট্রাম্প বলেছেন, এখন মহড়া পুরোপুরি বাতিল করার সময় নেই। তাই তিনি মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথকে নির্দেশ দিয়েছেন মহড়ার পরিসর ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে’ দেওয়ার। ১০ দিনব্যাপী ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়া গত সোমবার শুরু হয় এবং ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। এতে প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় এবং প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা অংশ নেবেন। ট্রাম্পের দাবি, তার প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে উত্তর কোরিয়া ছিল ‘হুমকিহীন ও সম্মানজনক’ আচরণকারী একটি দেশ।






