‘ঈশ্বরের ভূমিকায়’ চিকিৎসকরা!
নিষেধাজ্ঞার চাপে কিউবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায়

সংগৃহীত ছবি
একসময় বিশ্বের অন্যতম সফল সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল কিউবা। কিন্তু বর্তমানে দেশটির অস্ত্রোপচার করার আগে চিকিৎসকদের ঠিক করতে হচ্ছে যে, সীমিত সম্পদে কোন রোগীকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হবে। সেখানকার চিকিৎসকদের ভাষায়, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,তাদের যেন ‘ঈশ্বরের ভূমিকায়’ অবতীর্ণ হতে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার বিরুদ্ধে জ্বালানি অবরোধ ঘোষণা করেন। কিউবায় যদি কেউ জ্বালানি রপ্তানি করে তবে সেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়। আর এরপর থেকে শুধুমাত্র একটি বিদেশি তেলবাহী জাহাজ কিউবায় পৌঁছেছে। ফলে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট সহ জ্বালানি সংকট এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের স্বাস্থ্যখাতে।
কিউবার হাভানার উইলিয়াম সোলের শিশু হাসপাতালের সার্জারি ও অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের প্রধান আলিওথ ফার্নান্দেজ জানান যে, আগে নবজাতকদের অস্ত্রোপচারের পর বেঁচে থাকার হার ছিল ৯০ শতাংশের বেশি কিন্তু চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এমন নবজাতকদের অর্ধেকেরও বেশি মারা গেছে। তাঁর দাবি, অনেক মৃত্যুই অস্ত্রোপচারের জটিলতায় নয়। এই মৃত্যুগুলো সংক্রমণ, অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের সংকটের কারণে ঘটছে।
তিনি আরও বলেন আগে রোগীদের অপেক্ষার তালিকা এক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যেত কিন্তু এখন বিদ্যুৎ, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে সীমিত সুযোগে কাকে আগে অস্ত্রোপচার করা হবে সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, 'সবাই তো শিশু, কাকে বাঁচাব আর কাকে অপেক্ষা করাব- এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।'
প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অবরোধের মধ্যে রয়েছে কিউবা। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে । জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক সম্প্রতি বলেন যে, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে, যা অগ্রহণযোগ্য। তিনি নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুরোধও জানান।
অন্যদিকে কিউবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিশুক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার হার ৮৫ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশে নেমেছে। ২০১৭ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর হার ছিল ৪ যা ২০২৪ সালে ৭.৭ এবং ২০২৫ সালে ৯.৯ এ পৌঁছেছে। পাশাপাশি মাতৃমৃত্যুর হারও বেড়ে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ৪৪.১ জনে দাঁড়িয়েছে।
জানা যায়, বর্তমানে এক লাখের বেশি কিউবান বিভিন্ন অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫,১৫২ জন ক্যানসার রোগী এবং প্রায় ১২ হাজার শিশুও রয়েছে । কিডনি রোগী এরেনিয়া কারিয়ো জানান ডায়ালিসিসের যন্ত্র ও ওষুধের সংকটে অনেক সময় চার ঘণ্টার বদলে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিউবার তৈরি ৩৯৫ টি ওষুধের মধ্যে ৩০০টিই কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন করা হচ্ছেনা। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে বেশি দাম দিয়ে ওষুধ কিনছেন। হাভানার পারিবারিক চিকিৎসক রোকসানা মার্টিনেজ বলেন ফার্মেসিতেও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রায় নেই বললেই চলে। এমনকি বহু রোগীকে বাধ্য হয়ে ভেষজ চিকিৎসার পরামর্শ দিতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, 'কাজের চাপ এখন অসহনীয়। তবু রোগীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।'






