মানুষ থাকবে না এমন এক ভূখণ্ড!
সীমান্ত নয়, বদলাচ্ছে জীবনের মানচিত্র
- দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ‘অবাসযোগ্য বলয়’ ঘিরে আতঙ্ক
- রোমে প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা, অথচ মাটিতে চলছে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ; ২৪ গ্রাম ধ্বংসের দাবি ইসরায়েলের, ৬৮ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা বাসের অযোগ্য

রোমে যখন লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা সীমান্তবিরোধ মেটানো এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ খুঁজছেন, তখন মাটিতে ঘটছে ঠিক উল্টো ছবি। বাড়িঘর, কৃষিজমি, রাস্তা ও সরকারি অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে একের পর এক বিস্ফোরণে। দক্ষিণ লেবাননের বহু বাসিন্দার কাছে প্রশ্ন এখন আর শুধু ইসরায়েল কবে সরে যাবে তা নয়, বরং ফিরে যাওয়ার মতো কিছু আদৌ অবশিষ্ট থাকবে কি না।
মঙ্গলবার প্রকাশিত আরব নিউজ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েলের ঘোষিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখার ভেতরে চার থেকে দশ কিলোমিটার গভীর একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে। অঞ্চলটি লেবাননের ভূখণ্ডের ভেতরে হলেও সাধারণ নাগরিকের প্রবেশ সেখানে প্রায় বন্ধ। লেবাননের হিসাবে, যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা প্রায় ৫৯০ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ৬৫০ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছেছে।
‘মানুষ বসবাস করতে পারবে না এমন এক বলয়’
নেদারল্যান্ডসের ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক ও ওপেন-সোর্স তদন্তকারী আহমদ বাইদুন ৪ আগস্ট আরব নিউজ-কে বলেছেন, আইনি অবস্থান বা প্রত্যাহার নিয়ে চুক্তির ভাষা যা-ই হোক, বাস্তবে সেখানে এমন এক ভূখণ্ড তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ বাস করতে পারছে না। তাঁর ভাষায়, গোলাগুলি থেমে গেলেও এই ধ্বংস নিজে থেকে আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর কলাম লেখক ও ব্ল্যাক ওয়েভ গ্রন্থের লেখক কিম ঘাটাস সম্প্রতি জিজিরো মিডিয়ার ইয়ান ব্রেমারের সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননে শুধু বিমান হামলা বা কামানের গোলা নয়, পরিকল্পিতভাবে বিস্ফোরক বসিয়ে সম্পূর্ণ গ্রাম উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংসের যুক্তি সামনে রাখা হলেও এর ফল হচ্ছে একটি বসবাসের অযোগ্য বাফার অঞ্চল।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সম্প্রতি দাবি করেছেন, সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ২৪টি গ্রাম ধ্বংস করেছে, কারণ সেগুলো হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে লেবাননের বাসিন্দা ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের নামে পুরো গ্রাম, কৃষিজমি এবং বেসামরিক অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন করা কি প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক সামরিক পদক্ষেপের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে না?
ছবি কিনে নিজের গ্রামের খোঁজ
অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবার এখন নিজেদের গ্রামে কী অবশিষ্ট আছে, তা দেখতে বাণিজ্যিক উপগ্রহচিত্র কিনছে। সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের একটি সংগঠনের প্রধান তারেক মাজরানি আরব নিউজ-কে বলেছেন, তাঁরা এখন ছবি ছাড়া আর জানতে পারেন না, গ্রামগুলোতে কী রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এটি সাধারণ যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি নয়; বরং গ্রাম, ইতিহাস ও জমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মুছে দেওয়ার চেষ্টা।
সরকারি সংস্থাগুলোরও ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি যাচাই করার সুযোগ নেই। ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ঢুকতে হলে মার্কিন-লেবানিজ-ইসরায়েলি সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নাম, ছবি, গাড়ির তথ্যসহ আগাম অনুমতি চাইতে হয়। ইউনিফিলের টহল এবং সীমিত মানবিক বহর ছাড়া নিয়মিত প্রবেশাধিকার প্রায় নেই।
৬৮ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস বা বাসের অযোগ্য
প্রাথমিক লেবানিজ হিসাবে, প্রায় ৬৮ হাজার আবাসিক ইউনিট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে অথবা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিছু গ্রাম কার্যত ধ্বংসস্তূপের নিচে হারিয়ে গেছে। যুদ্ধের বিস্তৃত পর্যায়ে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। অনেকে ফিরলেও ঘর, দোকান, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানি ও বিদ্যুৎব্যবস্থা এখনও ভাঙাচোরা।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিলের মুখপাত্র ক্যান্ডিস আর্ডিয়েল ৮ জুলাই জেনেভায় জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, সহিংসতা কমলেও প্রতিদিন নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, বহু মানুষ ফিরে গিয়ে বাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল এবং মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংস অবস্থায় পেয়েছেন; সীমান্তঘেঁষা কিছু গ্রামে এখনও ফেরা সম্ভব নয়।
ইউনিফিল আরও স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েলের ঘোষিত ‘ইয়েলো লাইন’ জাতিসংঘ স্বীকৃত কোনও সীমান্ত নয়। জাতিসংঘের কাছে একমাত্র প্রাসঙ্গিক বিভাজনরেখা হলো ‘ব্লু লাইন’; তার উত্তরে ইসরায়েলি উপস্থিতি ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবের লঙ্ঘন।
কৃষিজমিতেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত
দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কিন্তু জলপাইবাগান, তামাকক্ষেত, ফলের বাগান ও চাষের জমি বিস্ফোরণ, আগুন, বুলডোজার এবং রাসায়নিক দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেবানিজ কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, কিছু জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য চাষের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে।
বাসিন্দারা ফিরে এলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু হয়নি। ছোট ব্যবসা খুলতে পারছে না, কৃষকেরা জমিতে যেতে পারছেন না, আর বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত জীবনে সঞ্চয় শেষ করে এখন প্রবাসী স্বজনের পাঠানো অর্থ বা ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে বেঁচে আছে। আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজের ‘দ্য সাসপেন্ডেড রিটার্ন’ গবেষণায় বলা হয়েছে, শারীরিকভাবে ফিরে আসা মানেই স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া নয়।
ইসরায়েলের যুক্তি: হিজবুল্লাহর হুমকি
ইসরায়েলের দাবি, দক্ষিণ লেবাননের সুড়ঙ্গ, অস্ত্রভান্ডার এবং সামরিক অবকাঠামো হিজবুল্লাহ বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামলার জন্য তৈরি করেছে। জুলাইয়ের শেষে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিউফোর্ট রিজ এলাকায় একটি বড় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংসের কথা জানায়। ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, প্রায় ৭০০ টন বিস্ফোরক ব্যবহার করে হিজবুল্লাহর কমান্ড ও হামলা অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে।
ইসরায়েল আরও বলেছে, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২৬ জুন স্বাক্ষরিত কাঠামো চুক্তিতে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ, পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি প্রত্যাহার এবং লেবানিজ সেনা মোতায়েনের কথা রয়েছে। কিন্তু হিজবুল্লাহ সেই চুক্তির স্বাক্ষরকারী নয় এবং অস্ত্র ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
‘পাইলট জোন’ নিয়ে আশা, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জাওতার আল-ঘারবিয়েহসহ কয়েকটি এলাকায় ‘পাইলট জোন’ চালু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনা সরে গেলে লেবানিজ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং বাসিন্দারা ফিরবেন। কিন্তু প্রথম পরীক্ষাতেই দেখা গেছে, বাড়িগুলো বসবাসের অযোগ্য, ইসরায়েলি সেনা কাছেই অবস্থান করছে এবং পুনর্গঠনের অর্থ নেই।
জাওতার আল-ঘারবিয়েহে ফেরা মহাসেন ফকিহ ও তাঁর স্বামী তাঁদের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে থাকতে না পেরে দোকানেই আশ্রয় নিয়েছেন। মহাসেন এপি-কে বলেন, সেখানে নিরাপত্তার অনুভূতি “এক শতাংশও” নেই। এখন পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারই ওই এলাকায় ফিরেছে।
রোমে আলোচনা, মাটিতে বিস্ফোরণ
৪ আগস্ট রোমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। আলোচনায় সীমান্তবিরোধ, ইসরায়েলি প্রত্যাহার, হিজবুল্লাহর অস্ত্র এবং ‘পাইলট জোন’ সম্প্রসারণের বিষয় রয়েছে। কিন্তু বৈঠকের ঠিক আগে বিউফোর্ট দুর্গসংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। আশপাশের দেইর মিমাস ও নাবাতিয়েহ পর্যন্ত ভূমিকম্পের মতো কম্পন অনুভূত হয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং অন্য নেতারা অভিযোগ করেছেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ যুদ্ধবিরতির মনোভাব ও আলোচনার পরিবেশের পরিপন্থী। তাঁদের আশঙ্কা, আলোচনায় প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও মাটিতে ইসরায়েল এমন এক বাস্তবতা তৈরি করছে, যা পরে স্থায়ী নিরাপত্তা বলয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে।
অস্থায়ী নিরাপত্তা বলয়, না স্থায়ী জনশূন্য অঞ্চল?
ইসরায়েল বলছে, তাদের অভিযান হিজবুল্লাহর সামরিক হুমকি দূর করার জন্য। লেবানন বলছে, পুরো গ্রাম মুছে দেওয়া এবং নাগরিকদের ফিরতে না দেওয়া আত্মরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে ভূমি ও জনসংখ্যার স্থায়ী বিন্যাস বদলের ঝুঁকি তৈরি করছে। ইউনিফিলও জানিয়েছে, ব্লু লাইনের উত্তরে ইসরায়েলি উপস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়।
এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষ। তাঁদের সামনে এখন তিনটি অনিশ্চয়তা–ইসরায়েল কবে সরে যাবে, পুনর্গঠনের অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং ফিরলেও সেখানে বসবাস করা আদৌ সম্ভব হবে কি না।
রোমের আলোচনায় হয়তো সীমান্তরেখা, প্রত্যাহারের ধাপ ও অস্ত্রের হিসাব নিয়ে দর-কষাকষি হবে। কিন্তু দক্ষিণ লেবাননের ধ্বংসস্তূপে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন পড়ে আছে: যে ভূখণ্ড থেকে মানুষকে সরিয়ে তার বাড়ি, জমি ও জীবনধারণের অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে, সেটিকে পরে কি সত্যিই ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ বলা যায়, না কি সেটি আসলে স্থায়ী জনশূন্য বলয় তৈরির আরেক নাম?






