হরমুজ থেকে তেহরানের রাস্তা
দুই লড়াই সামলাতে নিরাপত্তা কাঠামো বদল ইরানে
- ১০-১১ আগস্টের ধারাবাহিক রদবদলে জাতীয় নিরাপত্তা, বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজের শীর্ষে যুদ্ধ-অভিজ্ঞ কট্টরপন্থীরা
- লক্ষ্য একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা, অন্যদিকে দেশে সম্ভাব্য বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি দেশে সম্ভাব্য বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের জন্য আরেকটি লড়াই।
বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের আশঙ্কা, ভেতরে মূল্যস্ফীতি আর জীবনযাত্রার চাপে আবারও জনবিক্ষোভের ভয়। দুই দিকের এই চাপ সামলাতে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো যেন নতুন করে সাজাচ্ছেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। ক্ষমতায় আসার প্রায় ছয় মাস পর গত ১০ ও ১১ আগস্টের ধারাবাহিক নিয়োগে সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় ফিরিয়ে আনা হয়েছে ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞ, বিপ্লবী গার্ডঘনিষ্ঠ একদল কট্টরপন্থী কর্মকর্তাকে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রদবদলের বার্তা স্পষ্ট, তেহরান এখন শুধু পরবর্তী সমঝোতার অপেক্ষায় নেই; সমঝোতা ব্যর্থ হলে দীর্ঘ সংঘাত এবং একই সঙ্গে ঘরের ভেতর অস্থিরতা সামলানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
মোজতবা খামেনি গত ৯ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। তার মাত্র নয় দিন আগে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা এর আগে কখনও সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্বাহী পদে ছিলেন না, তবে বিপ্লবী গার্ড ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ক্ষমতায় আসার পরও তিনি প্রায় পুরো সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিত; নিরাপত্তার কারণেই তাকে আড়ালে রাখা হয়েছে বলে সরকারি ব্যাখ্যা।
এই দীর্ঘ নীরবতার মধ্যেই আগস্টে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ সামনে আসে।
গত ১০ আগস্ট সাবেক বিপ্লবী গার্ডপ্রধান মোহসেন রেজাইকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব করা হয়। ৭১ বছর বয়সী রেজাই ১৯৮১ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির কমান্ডার হন এবং প্রায় ১৬ বছর বাহিনীটির নেতৃত্ব দেন। ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের বড় অংশেই তিনি ছিলেন গার্ডের প্রধান। নতুন দায়িত্বের পাশাপাশি তাকে সর্বোচ্চ নেতার ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবেও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে রাখা হয়েছে।
রেজাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহপ্রবণ। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। জুনের সমঝোতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার নিয়োগকে তাই শুধু একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তার প্রত্যাবর্তন নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে মোজতবার নিজের বলয় শক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। রেজাইয়ের আগে ওই পদে ছিলেন মোহাম্মদ বাঘের জোলঘদর; তাকে এখন খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে।
একই সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি আবদোল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ করা হয়েছে। তার অন্যতম কাজ হবে নিয়মিত সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের যৌথ সামরিক কমান্ড আরও কেন্দ্রীভূত করা। বিপ্লবী গার্ডের প্রধান হিসেবে আহমদ ভাহিদির নিয়োগও আনুষ্ঠানিক করা হয়েছে। মোজতবার নির্দেশনায় তাকে একদিকে ‘সর্বোচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা’ নিশ্চিত করতে, অন্যদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে ‘শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযান’-এর জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
এই ভাষাই ইরানের সামরিক নীতির সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে যেখানে প্রধানত প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের কথা বলা হতো, সেখানে এখন প্রয়োজনে আগে থেকেই উদ্যোগ নিয়ে শত্রুকে মূল্য দিতে বাধ্য করার কথাও সামনে আসছে। ১৭ আগস্ট তেহরান আরও স্পষ্টভাবে বলেছে, কূটনীতি ব্যর্থ হলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তারা ‘সম্পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে যেতে পারে।
হরমুজই এখন এই শক্তির রাজনীতির কেন্দ্র। যুদ্ধের আগে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যেত। ইরান বলেছে, বর্তমানে প্রণালিটির চলাচল তাদের ‘ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে’। ওয়াশিংটন আবার ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের’ পাল্টা দাবি করছে। ফলে বিপ্লবী গার্ডের নৌ শাখার নেতৃত্বও মোজতবার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
কিন্তু সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নিয়োগটি হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নয়, ইরানের নিজের রাস্তাঘাটের জন্য।
বিপ্লবী গার্ডের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান হোসেইন তায়েবকে ফিরিয়ে এনে বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর প্রধান করা হয়েছে। বাসিজ অতীতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। তায়েব প্রায় ১৩ বছর বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা সংস্থার নেতৃত্বে ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ের দমন-পীড়নের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে। নতুন দায়িত্বে তাঁকে বাসিজের ‘জনগণভিত্তিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক’ শক্তিশালী করা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই নিয়োগের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সোমবার (১৭ আগস্ট) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ইরানের অর্থনীতি এখন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অবকাঠামো ধ্বংসের সম্মিলিত চাপে। জুলাইয়ে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে; খাদ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় ১২৮ শতাংশ বেড়েছে। নির্মাণকাজ থেমে যাচ্ছে, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে, পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও স্বীকার করেছেন, দেশের সমস্যা কয়েক গুণ বেড়েছে, অথচ আয় কমেছে।
জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক দুর্দশাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ সেই আন্দোলন দমন করে; রয়টার্সের হিসাবে তখন হাজারো মানুষ নিহত হন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার, তলব, দীর্ঘ কারাদণ্ড এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বেড়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। সরকার বলেছে, যুদ্ধকালীন স্থিতিশীলতা রক্ষায় এসব ব্যবস্থা প্রয়োজন। সমালোচকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে দমননীতি মিললে নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
এই আশঙ্কার কথাই উঠে এসেছে মোজতবার নতুন দল নিয়ে বিশ্লেষণে। ইরান-বিষয়ক বিশ্লেষক ওমিদ মেমারিয়ান দেশটির বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিকে এমন এক ‘ফুটন্ত পাত্রের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা অল্প সময়েই উপচে পড়তে পারে। তার মতে, যুদ্ধ ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার যে দুর্বলতা প্রকাশ করেছে, তার পর মোজতবা সবচেয়ে বেশি ভরসা রাখছেন পুরোনো প্রজন্মের যুদ্ধ-অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ওপর।
তবে এই রদবদলকে কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া হিসেবেও দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং নতুন নীতি অনেকটা লড়াইয়ের প্রস্তুতি রেখেই আলোচনা। পেজেশকিয়ানসহ তুলনামূলক বাস্তববাদী অংশ হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণকে দরকষাকষির হাতিয়ার বানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি চান। কট্টরপন্থীদের বক্তব্য, আগে সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে; তারপর শক্ত অবস্থান থেকে বেশি ছাড় আদায় করতে হবে।
এই দ্বন্দ্ব এরই মধ্যে প্রকাশ্য হয়েছে। একদিকে পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আলোচনার পক্ষে; অন্যদিকে কট্টর ‘পায়দারি’ শিবির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতাকেই সন্দেহের চোখে দেখে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও কয়েকবার পেজেশকিয়ান ও গালিবাফের আলোচনাসংক্রান্ত বক্তব্য মাঝপথে বন্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলেছেন, এটিকে এখনই শাসকগোষ্ঠীর ভাঙন বলা ঠিক হবে না বরং যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে এবং চুক্তির আগে কতটা চাপ প্রয়োগ করা হবে, সেই প্রশ্নে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাচ্ছে।
মোজতবার হিসাবটি তাই ঝুঁকিপূর্ণ। তেহরানের ধারণা, ইরান অর্থনৈতিক চাপ যত দিন সহ্য করতে পারবে, যুক্তরাষ্ট্র তত দিন উচ্চ জ্বালানি মূল্য, সামরিক ব্যয় ও নিজ দেশের রাজনৈতিক চাপ সামলাতে পারবে না। ওয়াশিংটনের হিসাব ঠিক উল্টো, ইরানের অর্থনীতি আগে ভেঙে পড়বে। ১৭ আগস্ট পরমাণু সমঝোতা নিয়ে ওয়াশিংটনের উল্লেখ করা ৬০ দিনের সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে, যদিও তেহরান ওই সময়সীমার বৈধতা নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
আর সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই নিজের প্রথম বড় ছাপ রাখলেন মোজতবা খামেনি। বাবার আমলের শেষ দিকে যে কর্মকর্তাদের অনেকেই অতীতের মানুষ বলে মনে হচ্ছিল, তাঁদেরই আবার সামনের সারিতে ফিরিয়ে আনছেন তিনি।
ইরানের নতুন নিরাপত্তা মানচিত্রের ছবিটা তাই বেশ স্পষ্ট: সীমান্তের বাইরে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তার জন্য অভিজ্ঞ সেনাপতি, আর দেশের ভেতরে ক্ষোভ ফেটে পড়লে তার জন্য পুরোনো দমনযন্ত্র। কূটনীতির দরজা এখনও খোলা, কিন্তু দরজার ঠিক পেছনেই সাজানো হচ্ছে যুদ্ধের ঘর। মোজতবা খামেনির এই রদবদলের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত সেখানেই, তেহরান শান্তির অপেক্ষায় বসে নেই, শান্তি ব্যর্থ হলে কী করবে সেই প্রস্তুতিই এখন আগে।






