গাজার ইসরায়েলি ‘হলুদ রেখা’ দক্ষিণ লেবাননেও, ভাগ্য কি একই?

দক্ষিণ লেবাননের মাইস আল-জাবাল গ্রামে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সাঁজোয়া যান ও খননযন্ত্র দিয়ে বাড়িঘর ভেঙে ফেলছে। ছবি : এএফপি
ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় গত ১৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইসরায়েল ও লেবানন। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর সঙ্গে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে একটি ‘হলুদ রেখা’ স্থাপন করে সেখানে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ)।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি মেনে নিলেও হুমকি দিয়েছেন, সীমান্তে ১০ কিলোমিটার (ছয় মাইল) গভীর একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ বজায় রাখবে আইডিএফ। লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চল হিজবুল্লার প্রধান ঘাঁটি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করলে মার্চের শুরুতে তেহরানের পক্ষ নেয় লেবাননের এ গোষ্ঠীটি। ইসরায়েলে হামলা শুরু করে তারা। জবাবে রাজধানী বৈরুতসহ লেবানন জুড়ে নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল।
শনিবার লেবাননের দক্ষিণে ‘হলুদ রেখা’ কার্যকর করেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। এটিকে ‘স্বেচ্ছাচারী সীমানা’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভেঙে ফেলার অঙ্গীকার করেছে হিজবুল্লাহ।
রবিবার পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর থেকে পূর্বে সিরিয়ার সঙ্গে লেবাননের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অঞ্চলকে হলুদ রেখা চিহ্নিত করে বিশেষ মানচিত্র প্রকাশ করে ইসরায়েল।
হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করতে এবং উত্তর ইসরায়েলিদের ওপর সরাসরি হুমকি বন্ধ করতে নৌবাহিনীর পাঁচটি ডিভিশন হলুদ রেখার ১০ কিলোমিটারে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়েছে আইডিএফ।
২০২৩ সালে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে এ সীমান্তে হয়েছিল ভয়াবহ সংঘাত। এই এলাকাটিতে থাকা গ্রামগুলো আগেরবারের মতো এবারও হয়েছে ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
বেশিরভাগ স্থানীয় বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সরে যাওয়ার আদেশ অমান্য করে রয়ে গেছেন কিছু খ্রিষ্টান গ্রামের বাসিন্দারা।
গাজার আর দক্ষিণ লেবাননের হলুদ রেখা কি একই?
গাজার শাসক দল হামাসের সঙ্গে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হয় ইসরায়েলের। সে সময় একইভাবে উপত্যকার ভেতরে ‘হলুদ রেখা’ কার্যকর করে আইডিএফ। এটির মাধ্যমে ইসরায়েল গাজায় নতুন সীমা টেনে দেয়।
এটি কার্যকরভাবে দুটি অংশে বিভক্ত করেছে গাজাকে: একটি সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকা যেখানে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার নেই এবং অন্যটি হামাসশাসিত এলাকা, যেখানের বাসিন্দারা ঝুঁকিতে থাকেন ইসরায়েলি হামলার।
এ রেখাটি গাজাবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে পাল্টে দিয়েছে এবং ঘরে ফিরতে দিচ্ছে না হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিকে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিয়মিত বলে আসছে, তারা গাজায় সীমান্তরেখার দিকে এগিয়ে আসা জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করছে এবং একই কাজ শুরু করেছে লেবাননেও।
লেবাননের সামরিক বিশেষজ্ঞ হাসান জুনি বলেছেন, লেবাননের হলুদ রেখা গাজার মতো একই জিনিস , এমনকি এর নামও একই।
তার মত, গাজায় এই সীমারেখাটি ছিল হামাসের সঙ্গে একটি চুক্তির ফল। লেবাননের চুক্তিতে এটি নেই… এটি ইসরায়েলের একতরফা আগ্রাসী সিদ্ধান্ত।
লেবাননের হাতে কী কী বিকল্প আছে?
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সোমবার বলেছেন, তেল আবিবের সঙ্গে সরাসরি পরিকল্পিত আলোচনার লক্ষ্য হলো শত্রুতা কমানো এবং দক্ষিণে অবসান ঘটানো ইসরায়েলি দখলদারত্বের।
এই যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের উল্লেখ নেই। তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েল সেনা সরাতে বাধ্য ছিল। যদিও ইসরায়েলি বাহিনী কখনোই পুরোপুরি সরে যায়নি দক্ষিণ লেবানন সীমান্ত থেকে।
বৈরুত ও তেল আবিবের পরিকল্পিত যুদ্ধবিরতি আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করেছে হিজবুল্লাহ। হলুদ রেখাকে ইসরায়েলি দখলদারত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা। পাশাপাশি এটির নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহারের আহ্বানও জানিয়েছে ইরানসমর্থিত গোষ্ঠীটি।
হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হাসান ফদলাল্লাহ সোমবার হুমকি দিয়েছেন, ‘আমরা নিজেদের এবং আমাদের দেশকে রক্ষা করার বৈধ অধিকার রাখি। আমি জোর দিয়ে বলছি, প্রতিরোধের মাধ্যমে এই হলুদ রেখা ভেঙে ফেলবে হিজবুল্লাহ।’
ফদলাল্লাহ প্রতিজ্ঞা করেছেন, ‘ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে কোনো বাফার জোন তৈরি করতে পারবে না এবং ইসরায়েলি সেনারা লেবানন ভূখণ্ডের ১ ইঞ্চি জমিতেও অবস্থান করলে তাদের তাড়িয়ে দেবে হিজবুল্লাহ।’
বার্তা সংস্থা এএফপি থেকে অনূদিত, ভাষান্তর : মাহমুদুল হাসান রিফাত

