নতুন সংকট ডিসালিনেশন
তেলের পর মধ্যপ্রাচ্যে এবার পানির যুদ্ধ

ইরানের একটি পানি শোধানাগার। ইনসেটে লেখক
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির মানে ছিল তেল, গ্যাস, পাইপলাইন এবং হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের মানচিত্রও আঁকা হতো জ্বালানিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ২০২৬ সালের সংঘাত একটি নতুন বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে– আগামীদিনের যুদ্ধ শুধু তেলের জন্য নয়, পানির জন্যও হতে পারে।
এই যুদ্ধে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উঠে এসেছে এমন একটি অবকাঠামো, যা ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন কয়েক দিনের মধ্যেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। আর তা হচ্ছে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (Desalination) প্ল্যান্ট।
সম্প্রতি কুয়েতের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ডিসালিনেশন প্ল্যান্টে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলার পর আন্তর্জাতিক মহল নড়েচড়ে বসেছে। ঘটনাটি কেবল একটি অবকাঠামোর ক্ষতির খবর নয়; এটি এমন এক সতর্কবার্তা, যা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের পানি নিরাপত্তাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Center for Strategic and International Studies (CSIS), Arab Center Washington DC, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম, Think Global Health এবং বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী Nature -এ বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনগুলোর ভাষা আলাদা হলেও তাদের মূল বার্তা এক—মধ্যপ্রাচ্যের ডিসালিনেশন অবকাঠামো এখন শুধু পানি উৎপাদনের প্রযুক্তি নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অন্যতম স্তম্ভ।
মরুভূমির জীবনরেখা
মধ্যপ্রাচ্য পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলের একটি। অনেক দেশে নদী নেই, প্রাকৃতিক হ্রদ নেই, পর্যাপ্ত ভূগর্ভস্থ পানিও নেই। বিশাল মরুভূমি, সীমিত বৃষ্টিপাত আর দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির কারণে এসব দেশের সামনে বহু বছর ধরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন ছিল—মানুষের জন্য নিরাপদ পানি কোথা থেকে আসবে? এই প্রশ্নের উত্তর হলো– সমুদ্র। সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করেই নগর, শিল্প, হাসপাতাল, কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবন সচল রাখা হয়।
ডিসালিনেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করে পানযোগ্য করা হয়। আজ সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন যে পানি পান করেন, তার বড় অংশই আসে এই সমুদ্র থেকে। সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলোর ৭০-৯৯ শতাংশ পানীয় পানি ডিসালিনেশন প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল।
ইরান নিজেও কিছু ডিসালিনেশন প্লান্টের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে দক্ষিণ উপকূলে। তবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নির্ভরতা অনেক বেশি। তাই ইরান যদি পাল্টা হামলায় এই অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে আঞ্চলিক চাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।ন্যাচার সাময়িকীতে প্রকাশিত আর্টিকেলটি মধ্যপ্রাচ্যের ডেসালিনেশন (সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ) শিল্পের ওপর এ পর্যন্ত প্রকাশিত সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণাগুলোর একটি। এতে গত ৬০ বছরের অগ্রগতি, বর্তমান সক্ষমতা, ব্যয়, গবেষণা, নীতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ন্যাচারের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে চালু থাকা ডিসালিনেশন প্ল্যান্টের উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৬৯.৩ মিলিয়ন ঘনমিটার। এর মধ্যে শুধু মধ্যপ্রাচ্য প্রায় ২৮.৯৬ মিলিয়ন ঘনমিটার/দিন।
থিংক গ্লোবাল হেলথের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের কার্যকর ডিসালিনেশন সক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশ এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। পরিকল্পনাধীন প্রকল্পসহ এই অংশ আরও বেশি। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় এখানেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করা হয়।
ন্যাচারের গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বে উৎপন্ন অত্যন্ত লবণাক্ত বর্জ্য (Brine)-এরও অর্ধেকের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আসে। ফলে এই শিল্প শুধু পানির উৎস নয়, পরিবেশ ব্যবস্থাপনারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলে প্রযুক্তিরও বড় পরিবর্তন হয়েছে। একসময় শক্তি-নির্ভর তাপীয় পদ্ধতি (MSF ও MED) বেশি ব্যবহৃত হলেও এখন দ্রুত বিস্তার ঘটছে Reverse Osmosis (RO) প্রযুক্তির। এতে বিদ্যুৎ কম লাগে, ব্যয় কম এবং পরিচালনাও তুলনামূলক সহজ।
ডিসালিনেশন প্লান্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ
পানি সংকট বলতে সাধারণভাবে আমরা পানীয় পানির অভাব বুঝি। কিন্তু একটি আধুনিক শহরের জন্য পানি কেবল পান করার উপাদান নয়; এটি প্রতিটি সেবার ভিত্তি। একটি বড় হাসপাতাল প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করে। অস্ত্রোপচার, ডায়ালাইসিস, আইসিইউ, জীবাণুমুক্তকরণ, ওষুধ প্রস্তুতি– সব ক্ষেত্রেই নিরাপদ পানি অপরিহার্য।
যদি ডিসালিনেশন প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে প্রথম ধাক্কা পড়বে হাসপাতালে। এরপর প্রভাব পড়বে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, নগর স্যানিটেশন, বিদ্যালয়, বিমানবন্দর, বন্দর এবং শিল্পকারখানায়। একটি বড় প্ল্যান্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, শত শত কিলোমিটার পাইপলাইন, নগর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চল, হাসপাতাল, বিমানবন্দর,এমনকি সামরিক ঘাঁটিও।
অর্থাৎ একটি প্ল্যান্ট অচল হলে কেবল পানির সরবরাহই ব্যাহত হয় না; পুরো নগর অর্থনীতি প্রভাবিত হতে পারে, একটি শহরের জীবনযাত্রার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; এটি একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। এ কারণেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এখন ডিসালিনেশন প্ল্যান্টকে Critical Infrastructure বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করছেন।
যুদ্ধের নতুন লক্ষ্যবস্তু
বিশ শতকের বহু সংঘাতে তেলক্ষেত্র, গ্যাস পাইপলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বন্দর ছিল প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু এখন আরও বিস্তৃত। ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা, স্যাটেলাইট, বিদ্যুৎ গ্রিড, ডেটা সেন্টার, বন্দর—এসবের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে পানি অবকাঠামো। কারণ যুদ্ধের উদ্দেশ্য শুধু প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা নয়; তার রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা। এই বাস্তবতায় ডিসালিনেশন প্ল্যান্ট একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
আরব সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিসালিনেশন প্ল্যান্টগুলোর অধিকাংশই উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এগুলো বৃহৎ, স্থির এবং সহজে শনাক্তযোগ্য অবকাঠামো। ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন দিয়ে আঘাত করা তুলনামূলক সহজ। আবার এসব প্ল্যান্টের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও সংযুক্ত থাকে। ফলে একটি হামলায় একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ ভেঙে পড়তে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, উপসাগরীয় শহরগুলোর অধিকাংশের পানির মজুত খুব সীমিত। কোথাও তিন দিন, কোথাও পাঁচ দিন, কোথাও এক সপ্তাহের মতো সংরক্ষণ ক্ষমতা রয়েছে। প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে গেলে খুব অল্প সময়েই নগরজীবন স্থবির হয়ে যেতে পারে।
গবেষকরা বলেছেন, যদি একাধিক ডিসালিনেশন প্ল্যান্ট একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেটি শুধু সামরিক সাফল্য নয়; বরং কয়েক কোটি মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক মানবিক সংকট ডেকে আনতে পারে।
থিংক গ্লোবাল হেলথ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ডিসালিনেশন প্ল্যান্ট ধ্বংস না করেও সেগুলো অচল করে দেওয়া সম্ভব। কীভাবে? যদি উপসাগরে বড় আকারে তেল ছড়িয়ে পড়ে, রাসায়নিক দূষণ ঘটে বা যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায়, তাহলে সমুদ্রের পানি দূষিত হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ডিসালিনেশন প্ল্যান্টগুলোকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে, কারণ দূষিত পানি বিশুদ্ধ করার সক্ষমতা সব প্রযুক্তির নেই। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে সমুদ্র দূষণও পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন
জেনেভা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূল নীতি হলো—বেসামরিক মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য অবকাঠামোকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা যাবে না। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, খাদ্য উৎপাদন, চিকিৎসাসেবা—এসব ক্ষেত্রকে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো একই কমপ্লেক্সে থাকলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন একটি স্থাপনায় একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পানি সরবরাহ এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থার কিছু অংশও যুক্ত থাকে। সেই কারণেই ডিসালিনেশন অবকাঠামো নিয়ে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনি বিতর্ক আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে সংকট আরও জটিল
মধ্যপ্রাচ্য এমনিতেই শুষ্ক মরু অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে ডেসালিনেশনের ওপর নির্ভরতা কমবে না; বরং আরও বাড়বে। এর অর্থ হলো, এই অবকাঠামোর নিরাপত্তা এখন কেবল প্রকৌশল বা সামরিক পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি জলবায়ু অভিযোজনেরও অংশ। বিশ্বব্যাপী পানি নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা এখন পানি নিরাপত্তাকে খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তার সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
অনেকে ভাবতে পারেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা; বাংলাদেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? কিন্তু বাস্তবে এই সম্পর্ক অনেক গভীর। বাংলাদেশের লক্ষাধিক মানুষ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত। সেখানে বড় ধরনের পানি সংকট সৃষ্টি হলে তাদের জীবনযাত্রা, কর্মপরিবেশ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রভাবিত হতে পারে। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে কিছু অঞ্চলে ডিসালিনেশন প্রযুক্তির প্রয়োজন বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে এখন থেকেই প্রযুক্তি, গবেষণা, ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে পরিকল্পনা করা জরুরি। বিশেষ করে বড় শহরগুলোর পানি সরবরাহে একাধিক উৎস নিশ্চিত করা, বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা হতে পারে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড






