ধ্বংসস্তূপে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন গাজার কৃষকরা

ইসরায়েলি হামলায় খামার হারানোর পর গাজার অনেক কৃষক নতুন জমি তৈরি করেছেন। ছবি : সংগৃহীত
যুদ্ধ গাজার কৃষিজমি কেড়ে নিয়েছে, ধ্বংস করেছে সেচব্যবস্থা, কূপ, খামার ও গ্রিনহাউস। তবু মাটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি কৃষকরা।
নুসেরাত শরণার্থী শিবিরের ছোট ছোট জমি ও গ্রিনহাউসে আবারও চারা রোপণ করছেন তারা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কৃষির এই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোই তাদের জীবন ও জীবিকা ফিরে পাওয়ার নতুন আশা দেখাচ্ছে।
মোহাম্মদ আল-হালাবি তাদেরই একজন। নুসেরাত শরণার্থী শিবিরের মাঝখানে মাত্র ৩০০ বর্গমিটারের একটি জমিতে টমেটো ও বেগুনের চারা পরিচর্যা করছেন তিনি। যুদ্ধের আগে যে বিশাল জমি ছিল তার পরিবারের জীবিকার মূল ভিত্তি, বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর এই ছোট্ট জমিটিই এখন তার একমাত্র অবলম্বন।
উত্তর গাজার জাবালিয়ায় বাবা মারওয়ানের সঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার বর্গমিটার বা ১০ একর জমিতে কৃষিকাজ করতেন আল-হালাবি। সেখানে স্ট্রবেরি, টমেটো, ফুল, আলু ও বেগুন চাষ হতো। তার চার সন্তান—৩০ বছরের মাহমুদ, ২৭ বছরের রিহাম, ২৪ বছরের ঈসা ও ২০ বছরের ওমর—বাবার সঙ্গে কাজ করতেন। কৃষিই ছিল পুরো পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস।
কিন্তু ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই জমিতে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান তাদের সবকিছু বদলে দেয়। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় পুরো জমি। এখন সেখানে পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ, যুদ্ধের নানা অবশেষ ও ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো। জমিটিকে আবার চাষের উপযোগী করতে প্রয়োজন ব্যাপক পুনর্বাসন।
আল-হালাবি বলেছেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজ করছি। জমিই আমার জীবন। সারাজীবন এই জমি চাষ করেই কেটেছে।’
বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরও তাই কৃষি ছাড়তে পারেননি তিনি। নুসেরাতে ছোট একটি জমি ভাড়া নিয়ে যা পেয়েছেন, তাই দিয়ে শুরু করেছেন নতুন করে।
‘কৃষিই আমার পেশা। বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরও আমি চাষ ছাড়তে পারিনি। এক টুকরো ছোট জমি পেয়ে যা পেয়েছি তাই লাগিয়েছি,’ বলেছেন তিনি।
এই জমি থেকে প্রতিটি ফসলে মাত্র কয়েক কেজি ফলন হয়। পরিবারের চাহিদা মেটানোই কঠিন, বিক্রি করার মতো বাড়তি ফসল থাকার প্রশ্নও নেই। তারপরও চারা বড় হতে দেখা আল-হালাবির কাছে আশার বিষয়।
তিনি বলেছেন, ‘গাছ বড় হতে আর ফল ধরতে দেখলে মনে হয়, আমি এখনও চাষ করতে পারি। জমি ছোট হলেও সম্ভাবনা আছে। আশা করি ফসল হবেই।’
গাজার কৃষিতে ভয়াবহ ক্ষত
আল-হালাবির ছোট জমির গল্পটি আসলে গাজার কৃষকদের বড় সংকটেরই প্রতিচ্ছবি।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে কৃষিজমির ৮৭ শতাংশের বেশি ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ৮ হাজার ৭০০ কৃষি কূপ নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ধ্বংস হয়েছে ৭ হাজার ৭৪৮টি গবাদিপশু, ভেড়া ও হাঁস-মুরগির খামার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৭ শতাংশের বেশি গ্রিনহাউসও।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। বার্ষিক শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন ৫ লাখ ২৪ হাজার টন থেকে কমে মাত্র ২০ হাজার টনে নেমে এসেছে।
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মহাপরিচালক নাসের দ্বীব বলেছেন, ক্ষতি শুধু ফসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জমি, পানির উৎস, সেচব্যবস্থা, কূপ ও কৃষি অবকাঠামো—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘কৃষকরা এখন একসঙ্গে বহু সমস্যার মুখোমুখি। জমিতে ফিরে গেলেও সেটা চাষের উপযোগী নয়। মাটি পুনর্বাসন করতে হবে, পানির উৎস ও সেচব্যবস্থা মেরামত করতে হবে। বীজ, সার ও যন্ত্রপাতিও লাগবে।’
হারানো জমির বদলে নতুন গ্রিনহাউস
শুধু আল-হালাবি নন, গাজার আরও অনেক কৃষক ধ্বংস হওয়া জমির বিকল্প হিসেবে ছোট পরিসরে আবার শুরু করার চেষ্টা করছেন।
শেখ আজলীন এলাকার মোহাম্মদ আবদুল নাসের হাসান আল-জাদবার কৃষিজমিও যুদ্ধের সময় হাতছাড়া হয়েছে। তার জমি পড়ে যায় ‘ইয়োলো লাইন’-এর ওপারে, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ওই এলাকায় গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকায় নিজের জমিতে আর ফিরতে পারছেন না তিনি।
এখন দেইর আল-বালাহে এক টুকরো জমি ভাড়া নিয়ে নার্সারি ও গ্রিনহাউস গড়ে তুলেছেন আল-জাদবা। সেখানে টমেটো, বেগুন ও মরিচ চাষ করছেন। বেলজিয়ামের একটি উন্নয়ন তহবিল থেকে পাওয়া সহায়তায় গ্রিনহাউস তৈরি ও কৃষি উপকরণ কিনেছেন তিনি।
আল-জাদবা বলেছেন, ‘খামার ভাড়া নেওয়ার আগে আমার আয় ছিল শূন্য। এখন পরিবার চালাতে পারছি। মাসে প্রায় ১ হাজার ১৫ ডলার আয় হচ্ছে।’
এই উদ্যোগে আরও দুজন কৃষককে স্থায়ীভাবে কাজে নিয়েছেন তিনি। দুজনই আগে বেকার ছিলেন।
আল-জাদবা বলেছেন, ‘এই ছোট ছোট কৃষি প্রকল্পগুলো আমার কাছে কাজ ফিরে পাওয়া, আয়ের উৎস পুনরুদ্ধার করা এবং আবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সত্যিকারের সুযোগ।’
গাজার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখন ধ্বংসস্তূপ। কোথাও পড়ে আছে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া জমি, কোথাও হারিয়ে গেছে সেচের কূপ, কোথাও পৌঁছানোই সম্ভব নয়। তবু সেই ধ্বংসের মধ্যেই কোথাও কোথাও সবুজ হয়ে উঠছে নতুন চারা।
ছোট জমি, ভাড়া করা প্লট আর কয়েকটি গ্রিনহাউস—এই সামান্য অবলম্বনেই গাজার কৃষকরা আবারও মাটির সঙ্গে নিজেদের জীবন জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সূত্র : আলজাজিরা






