মার্কিন অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতির মুখে মার্কিনিরাই
- দক্ষিণ লেবাননে একের পর এক বাড়ি ধ্বংস
- স্যাটেলাইট ছবিতে নিজের ভিটে খুঁজছেন প্রবাসীরা
- ক্ষোভ বাড়ছে লেবানিজ-আমেরিকানদের মধ্যে
- প্রশ্নের মুখে ওয়াশিংটনের নীরবতা

ছবি: রয়টার্স
বাড়িটি হয়তো লেবাননে। কিন্তু মালিক থাকেন নিউইয়র্ক, মিশিগান কিংবা আমেরিকার অন্য কোনো শহরে। বছরের পর বছর কাজ করে জমানো অর্থে কেউ বানিয়েছেন অবসরের ঠিকানা, কেউ রেখেছেন বাবা-মায়ের স্মৃতি, কারও কাছে সেটিই ছিল পূর্বপুরুষের শেষ চিহ্ন৷ এখন তাদের অনেকেই বাড়ি আছে কি না, সেটুকু জানতেও নির্ভর করছেন স্যাটেলাইট ছবির উপর।
লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যে বাড়িঘর হারানো মার্কিন নাগরিকদের এই অভিজ্ঞতাই তুলে ধরেছে সিএনএন-এর ৬ আগস্টের প্রতিবেদন। দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় মাসের পর মাস সামরিক অভিযান, বিমান হামলা ও বাড়ি ধ্বংসের মধ্যে লেবানিজ বংশোদ্ভূত বহু মার্কিন নাগরিকের সম্পত্তিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। একই ধরনের ধ্বংসের ঘটনা দক্ষিণের ইয়ারুন, বিনত জবেইলসহ একাধিক এলাকায় অন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে।
দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বহু বাসিন্দাকে নিজ এলাকায় ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে নিজেদের বাড়ির অবস্থা জানতে অনেকে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করছেন।
ইয়ারুন গ্রামের একাধিক পরিবার এভাবেই দেখেছে–যেখানে তাদের বাড়ি ছিল, সেখানে এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে থাকা হান্না নামের এক লেবানিজ-আমেরিকান স্যাটেলাইট ছবিতে দেখেছেন, তার ৯২ বছর বয়সী মায়ের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের আগের ক্ষয়ক্ষতি সারিয়ে ফেব্রুয়ারিতে বৃদ্ধা আবার বাড়িটিতে ফিরেছিলেন। পরে নতুন ছবিতে দেখা যায়, বাড়িটির আর অস্তিত্ব নেই।
নিজের জন্য ছোট একটি বাড়ি নির্মাণেও প্রায় ৩০ হাজার ডলার ব্যয় করেছিলেন তিনি। ভিত্তি ও পাথরের দেয়াল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। নতুন স্যাটেলাইট ছবিতে আশপাশের আরও বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি একটি বুলডোজারের উপস্থিতিও দেখা যায় বলে তার ভাষ্য।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শুধু অভিবাসনের নয়। কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ ও ইসরায়েলি দখলের সময় অঞ্চলটি ছেড়ে বহু মানুষ আমেরিকায় স্থায়ী হয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি।
অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা বা চাকরি করে জমানো অর্থ পাঠিয়ে লেবাননে বাড়ি বানিয়েছেন। গ্রীষ্মে পরিবার নিয়ে সেখানে যেতেন। কেউ ভবিষ্যতে অবসর কাটানোর কথা ভেবেছিলেন। আবার বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন স্থায়ীভাবে থাকতেন সেই বাড়িতে।
মিশিগানের লেবানিজ-আমেরিকান সমাজের সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের বিনত জবেইলের সম্পর্ক বিশেষভাবে গভীর। জুলাইয়ে প্রকাশিত আরেক অনুসন্ধানে দেখা যায়, সেখানে বহু মার্কিন নাগরিকের পারিবারিক বাড়ি সামরিক অভিযানে ধ্বংস হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবি ও মাটিতে ধারণ করা ভিডিও দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করা হয়েছিল।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনটির গুরুত্বও এখানেই, লেবাননের যুদ্ধকে শুধু ‘বিদেশের সংঘাত’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সরাসরি ক্ষত এখন মার্কিন পরিবারের ঘর পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতি লেবানিজ-আমেরিকানদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষোভও বাড়িয়েছে। জুনে কয়েকজন লেবানিজ-আমেরিকান নেতা মার্কিন সরকারি সংস্থা এবং ইসরায়েলকে অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও অর্থসহায়তা দেওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত মামলা করার উদ্যোগের কথা জানান। আরব আমেরিকান সিভিল রাইটস লীগের সভাপতি নাসের বেইদুনের দাবি, ইসরায়েলি অভিযানে সম্পত্তি হারানো লেবানিজ বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা অনেক। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, মার্কিন করদাতাদের অর্থে সহায়তা পাওয়া যুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদেরই বাড়িঘর ধ্বংস হচ্ছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি কোন অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, কিংবা সেটি মার্কিন সরবরাহ করা অস্ত্র ছিল কি না, প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে তা প্রমাণিত নয়। ফলে এই অভিযোগকে লেবানিজ-আমেরিকানদের রাজনৈতিক ও আইনি দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের একটি জায়গা, শুধু যুদ্ধের সময় বিমান হামলায় নয়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরায়েলি বাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকায় বাড়িঘর ভাঙছিল। সীমান্তের প্রায় চার কিলোমিটার ভেতরে বেইত লিফ গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
ইসরায়েল বলেছে, এসব সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি ধ্বংস করা। কিন্তু লেবাননের কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ধ্বংসের পরিমাণ শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নেই; আবাসিক এলাকা, কৃষিজমি এবং মৌলিক অবকাঠামোর বিপুল ক্ষতি হয়েছে। মে মাসের শেষ নাগাদ ইসরায়েলি হামলা ও উচ্ছেদ নির্দেশের কারণে দক্ষিণ লেবাননের প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা কার্যত বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে আসে।
সর্বশেষ যুদ্ধটি শুরু হয় মার্চে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালালে লেবাননে যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হয়।
এর পরিণতি ভয়াবহ। বিভিন্ন হিসাবে দক্ষিণ লেবাননে ২৪টি গ্রাম এবং ২০ হাজার পর্যন্ত বাড়ি ধ্বংস বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন দশ লক্ষের বেশি মানুষ।
সিএনএন-এর বৃহস্পতিবারের নিজস্ব সম্প্রচারেও দক্ষিণের জাওতার গ্রাম থেকে ফিরে আসা বাসিন্দাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর দেখানো হয়। কারও বাড়ির দেয়াল উড়ে গেছে, শিশুদের শোবার ঘরের উপর গুলির চিহ্ন। এক পরিবারের সদস্য জানান, কয়েক মাস বৈরুতের একটি স্কুলে আশ্রয় নেওয়ার পর সেনাবাহিনী অনুমতি দিলে তারা ফিরেছেন। বাড়ির ভেতরে তখনও ইসরায়েলি সেনাদের ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র ছিল বলে তাঁর দাবি।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ফিরে আসা এক বাসিন্দা সিএনএনকে বলেছেন, তারা শান্তি ও নিরাপত্তা চান। এমন একটি রাষ্ট্র চান, যে রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে পারবে।
কিন্তু বাস্তবতা এখনও অনিশ্চিত। জুলাইয়ের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার আওতায় দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি এলাকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরে গেলে সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। কিন্তু জাওতার আল-গারবিয়েহর অবকাঠামো ও বাড়িঘরের ধ্বংস এত ব্যাপক যে লেবাননের সেনাবাহিনী এলাকাটিকে তখনও বসবাসের অনুপযোগী ঘোষণা করেছিল।
এমনকি যেসব পরিবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের অনেকের সামনে প্রশ্ন, "ফিরবেন কোথায়?"
বাড়ি দাঁড়িয়ে নেই। পানি, বিদ্যুৎ, রাস্তা নেই। ক্ষেত নষ্ট। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের ঝুঁকিও রয়েছে।
এদিকে, পুনর্গঠনের চেষ্টা চলার মধ্যেই বুধ ও বৃহস্পতিবার আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দক্ষিণ লেবানন।
ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় একটি ভবনে বিস্ফোরণে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত ও চারজন গুরুতর আহত হন। এরপর দক্ষিণ লেবাননের একাধিক এলাকায় নতুন করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, তিবনিনে একটি হামলায় একজন নিহত এবং ১২ জন আহত হন।
ইসরায়েল প্রথমে ঘটনাটিকে হিজবুল্লাহর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করলেও পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী সরাসরি দায় নির্ধারণ থেকে বিরত থাকেন। বিস্ফোরকটি কখন স্থাপন করা হয়েছিল, সেটিও নিশ্চিত নয়।
এই নতুন সহিংসতা এমন সময়ে, যখন রোমে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আলোচনা চলছে। আলোচনার লক্ষ্য—ইসরায়েলি সেনাদের ধাপে ধাপে প্রত্যাহার এবং ওই এলাকাগুলোতে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন।
‘আমেরিকান’ পরিচয়ও বাড়ি বাঁচাতে পারেনি
সিএনএন-এর প্রতিবেদনের সবচেয়ে অবাক করা দিক সম্ভবত এখানেই।
এই বাড়িগুলোর মালিকদের কেউ শুধু লেবাননের নাগরিক নন, তারা যুক্তরাষ্ট্রেরও নাগরিক। নিয়মিত কর দেন আমেরিকায়, সন্তান বড় করেছেন সেখানে, ব্যবসা গড়েছেন সেখানে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের যুদ্ধে তাঁদের পারিবারিক বাড়িও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচেনি।
মিশিগানের ডিয়ারবর্নে বসবাসকারী আব্বাস আলাউইয়ে এপ্রিলেই জানিয়েছিলেন, তাঁর পরিবারের লেবাননের বাড়িটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। একটি ছবিতে যে বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, পরের ছবিতে সেটি মাটিতে মিশে থাকতে দেখা যায়।
আর ইয়ারুনের পরিবারগুলোর কাছে স্যাটেলাইট ছবি যেন এখন নির্মম সংবাদবাহক। ছবি আসার অপেক্ষা, মানচিত্রে নিজের জমি খোঁজা, তারপর একটি প্রশ্ন–"বাড়িটা এখনও আছে তো?" অনেকের ক্ষেত্রে উত্তরটি আর দীর্ঘ নয়। "নেই"৷




