তেহরানের বাসিন্দার আর্তনাদ
নিজ শহরেই হয়ে গেলাম শরণার্থী

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত নিজের বাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন এক ইরানি
২৭ বছর বয়সী ইরানি তরুণী সানা। পশ্চিম তেহরানের দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটে থাকেন ফাতেমেহ নামে একজনের সঙ্গে।
অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা সানা কাজ করেন একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষক হিসেবে। ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে তিনি বেঁচে যান। ফেব্রুয়ারির শেষে আবারও যখন নতুন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন শহর ছেড়ে আর পালাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেন নিজের সঙ্গেই।
সানা এই কথাগুলো বলছিলেন কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদক আরিয়া ফারাহান্দকে।
সানা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগের রাতটা ছিল উদ্বেগে ভরা। ফোনে আসা প্রতিটি খবরে একই প্রশ্ন—আক্রমণ হবে, না কি হবে না? গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন তিনি। আগেরবার হামলাগুলো হয়েছিল মধ্যরাতে। তাই চোখ ছিল খবরে।
তার মতে, যখন কিছুই ঘটল না, তখন মনে করছিলাম রাতটা হয়ত কেটে গেছে। কিছু পার্সিয়ান গান চালিয়ে আর একটু পানীয় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। নিজেকে বোঝালেন সব ঠিক আছে।
‘কিন্তু ভুল ছিলাম আমি’, জানালেন এ তরুণী।
স্মৃতিচারণ করে সানা জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে তেহরানে। তখন ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলেন তিনি। তখনও বিস্ফোরণের শব্দ আসেনি তাদের এলাকায়। তবুও কী হবে বুঝতে পারছিলেন না তিনি।
ফোনে বারবার মেসেজ এলেও সেগুলো দেখার মতো শক্তি পাচ্ছিলেন না সানা। এমন সময় কল করে তিনি ঠিক আছেন কিনা জানতে চান তার প্রেমিক। তিনি উত্তর দেওয়ার আগেই সে বলে ফেলল, ‘ওরা হামলা করেছে।’ আর কিছু বলার দরকার পড়ল না তাকে।
সানা জানালেন, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফোন করতে শুরু করলেন আমার মা, বাবা ও ছোট বোন। রাজধানী ছেড়ে চলে যেতে অনুরোধ করছিলেন তারা। সাড়ি মাজান্দারান প্রদেশে ২৫০ কিলোমিটার উত্তরে আমাদের বাড়ি। আমি আমার বিড়াল ফানদোগের দিকে তাকালাম। সেও তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।
‘তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, যা-ই হোক তেহরান ছাড়ব না আমি।’
গত বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল সানাকে। তিনি দুঃখ করে জানান, যুদ্ধের তৃতীয় দিনে শহর ছাড়তে বাধ্য করে আমার পরিবার। আমার বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি চালানো ছিল নারকীয়। আর বাবা-মায়ের বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকা, শান্তি পাইনি কোথাও। এবার আর না।
‘দুপুরের দিকে অফিস থেকে ফিরল আমার রুমমেট ফাতেমেহ। স্বাভাবিক দেড় ঘণ্টার পথ তার আসতে লেগেছে চার ঘণ্টা। ঘরে ঢুকেই কাঁদতে শুরু করল সে। জানাল, প্রথম বিস্ফোরণটা হয়েছিল তার অফিসের কাছেই।’
এক ভয়াবহ রুটিন
ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর নিয়মে পরিণত হলো যুদ্ধ। সানা উদ্বেগ নিয়ে বলেছেন, আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, কখন হামলার আশঙ্কা বেশি। ভোরে, বিকেলে, আর রাত ১১টার পর। বোমাবর্ষণ কখনোই যথেষ্ট অনুমানযোগ্য ছিল না নিরাপদ থাকার জন্য। কিন্তু এই সময়গুলোতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতাম আমরা।
‘বাইরে যাওয়া এড়াতে অনলাইনে আনাতাম বাজারের জিনিসি। খুব প্রয়োজন হলে ফিরে আসতাম দ্রুত গিয়ে।’
‘ইন্টারনেট ছিল আরেক যন্ত্রণা। বিদেশে থাকা বন্ধুরা ভাবত, ‘ইন্টারনেট নেই’ মানে শুধু সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ। বাস্তবে কিছুই খোলা যেত না—গুগলও না। প্রতিদিন নতুন ভিপিএন কিনতাম, একদিন কাজ করত, পরদিন আর না’, যোগ করেন এই তরুণী।
যুদ্ধের মধ্যে কীভাবে দিন পার করলেন সানা জানালেন সে কথা। তিনি তুলে ধরেন, আমার দৈনন্দিন জীবন চলত পডকাস্ট আর ইউটিউবে। সেগুলোও নেই এখন। সময় কাটাতাম স্থানীয় সার্ভার থেকে বিদেশি সিরিজ ডাউনলোড করে। পড়তাম বই। শিউরে উঠেছিলাম ২০০৩ সালের ‘বাগদাদ ডায়েরিজ’ নামে একটি বই পড়তে গিয়ে। আমাদের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে তার ভয়ংকর মিল।
সেই ভয়ংকর রাত
ভয়ংকর স্মৃতির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ভেঙে পড়েন সানা। ‘মার্চ ১৬ আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ রাতগুলোর একটি। রাত ২টা ৩০। ঘুম ভেঙে গেল এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে। তাকিয়ে দেখলাম জেগে ছিল ফাতেমেহ। আমরা দৌড়ে করিডরে গেলাম, জানালা দিয়ে তাকালাম—হঠাৎ তীব্র আলো, তারপর আরেকটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ। চিৎকার করে উঠে সিঁড়ি দিয়ে নিচে পার্কিংয়ে নেমে গেলাম আমরা। সেখানে জড়ো হচ্ছিলেন প্রতিবেশীরাও।’
পরপর ঘটে আরও ৭-৮টি বিস্ফোরণ। তার মতে, বোমা পড়ছিল আমাদের খুব কাছেই মেহরাবাদ বিমানবন্দরের। আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, এবার বোধহয় বাঁচব না।
‘উপরে ফিরে এসে দেখি, আমার বিড়াল আলমারির ভেতর লুকিয়ে কাঁপছিল। ফোনে অসংখ্য মিসড কল। পরিবার আর প্রেমিক আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল খবর দেখে। বিড়ালটাকে ফেলে আসার জন্য অপরাধবোধ আমাকে জর্জরিত করল। সবাইকে ফোন করে জানালাম বেঁচে আছি।’
‘এরপর থেকে আমি নিজ শহরেই শরণার্থী মনে করতে শুরু করি নিজেকে’, একরাশ দুঃখ করে বলেন সানা।
ঘরের পর অফিস থেকেও হতাশার খবর পেতে যাচ্ছিলেন সানা। তবে রক্ষা পান এই যাত্রায়। অফিসে যাওয়ার পর থেকে উদ্বেগে ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেছেন, ৪ এপ্রিল প্রথম দিন অফিসে ফেরা। কার চাকরি থাকবে, কার থাকবে না ঠিক হবে সেদিনই। অফিসে পৌঁছে দেখি, এক সহকর্মী হাতে ছাঁটাইপত্র নিয়ে কাঁদছে। যুদ্ধের মধ্যে নতুন কাজ কোথায় পাবে, কীভাবে ভাড়া দেবে এগুলোই বলছিলেন তিনি। দুপুরেই ৪১ জনের মধ্যে ছাঁটাই হলো ১৮ জন। কাজ করার মতো মানসিকতা ছিল না কারও। চাকরিটা ধরে রাখতে পেরেছিলাম আমি।
‘তিন দিন পর অফিস থেকে ফেরার পথে দেখলাম ফাঁকা শহর। যে পথ এক ঘণ্টা লাগত এখন সেই পথ শেষে ২০ মিনিটে। শুধু পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন।’
যুদ্ধবিরতি সানাকে অবাক করেছে। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না এমনটা ঘটতে পারে। ‘মনে হচ্ছিল, হয়তো আবার শুরু হবে। কিন্তু তা হয়নি।’

