গাজায় ঈদ এখন শুধু কান্না আর বেঁচে থাকার লড়াই

ঈদের পুরোনো একটি ছবি হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে ছিলেন ওয়ালা বারুদ। ছবিতে থাকা ২২ জনের মধ্যে আজ বেঁচে আছেন মাত্র ৯ জন। বাকিরা সবাই নিহত হয়েছেন ইসরায়েলি হামলায়। একসময় ঈদের দিন এই মানুষগুলোই একসঙ্গে বসে খাবার খেতেন, কোরবানির মাংস ভাগাভাগি করতেন, শিশুদের হাসিতে মুখর থাকত পুরো বাড়ি। কিন্তু এবার গাজায় ঈদ এসেছে শোক হয়ে। স্বজন হারানোর বেদনা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামই এখন সেখানে মানুষের একমাত্র বাস্তবতা।
গাজার শাতি শরণার্থী শিবিরে প্রতি ঈদে উৎসবের আমেজে মেতে উঠত বারুদ পরিবার। ভোর হতেই আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া, কোরবানি দেওয়া, সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা সবকিছুই ছিল তাদের দীর্ঘদিনের রীতি। দিনের শেষে পুরো পরিবার মিলে একটি ছবি তুলতেন তারা। কিন্তু এখন সেই ছবিটিই যেন তাদের শেষ সুখস্মৃতি।
ওয়ালা বারুদের পরিবারের ৮০ জনেরও বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন ইসরায়েলি হামলায়। কয়েকদিন আগেই মারা গেছেন তার ভাই বাহা বারুদ। ফলে এবারের ঈদ তাদের শুরু হয়েছে শোকের তাঁবু দিয়ে, শেষ হচ্ছে হাসপাতালের মর্গে।
আল জাজিরাকে ওয়ালা বলেছেন, ‘যুদ্ধ আমাদের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমরা কখনো ভাবিনি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও শোকের তাঁবু খুলতে হবে।’
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের চলমান হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ঈদ কখনো তাঁবুতে আসে না
গাজার এক ফুটপাতে ছোট্ট একটি তাঁবুতে বসবাস করেন বৃদ্ধা হাজ্জা শামা আল-জোরবাতলি। যুদ্ধে হারিয়েছেন স্বামী ও নিজের বাড়ি। ঈদ নিয়ে প্রশ্ন করতেই কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বলেছেন, ‘ঈদ কখনো তাঁবুতে আসে না।’
তার তাঁবুতে নেই বিদ্যুৎ, ফোন, টেলিভিশন কিংবা ইন্টারনেট। বাইরের পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এই নারী জানেন না আজ কী দিন।
মক্কায় হজ পালনরত মুসল্লিদের একটি ভিডিও দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেছেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল একদিন হজ করব। কিন্তু এখন তো খাবারই জোটে না।’
সত্তরের বেশি বয়সী এই নারী স্মৃতিচারণ করে জানান, একসময় ঈদের আগে নাতি-নাতনিদের জন্য নতুন পোশাক কিনতেন, মিষ্টি আনতেন, নিজ হাতে কেক বানাতেন। আজ তার ভাষ্য, ‘এবারের ঈদ শুধু শহীদদের ঈদ। এখানে আনন্দ নেই, আছে শুধু শোক।’ নিজের জীর্ণ পোশাক দেখিয়ে তিনি বলেছেন, ‘এই একটি কাপড় ধুয়ে আরেকটি পরে থাকি।’
যুদ্ধ আমাদের গুঁড়িয়ে দিয়েছে
পাশের তাঁবুতেই থাকেন মোহাম্মদ ওবেইদ। যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে তার স্ত্রী, দুই পা এবং বাড়ি। হুইলচেয়ারে বসে দিন কাটান তিনি। সময় কাটে কোরআন তেলাওয়াত করে।
তিনি বলেছেন, ‘একসময় আমার চারতলা বাড়ি ছিল। মানুষের মাঝে সম্মান নিয়ে চলতাম। আজ একটি তাঁবুই আমার শেষ ঠিকানা।’
কথা বলতে বলতে নিজের কাটা পায়ের জায়গায় হাত রাখেন তিনি। ভারী কণ্ঠে, আজকের ঈদ আর অন্য দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যুদ্ধ আমাদের গুঁড়িয়ে দিয়েছে।’
একসময় তিনি কোরবানি দিতেন, প্রতিবেশীদের মাঝে মাংস বিতরণ করতেন। আর এখন অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় থাকতে হয় তাকে।
কোরবানিহীন ঈদ
গাজায় এবার প্রায় নেই কোরবানির পশু। সীমান্ত বন্ধ, পশুর সংকট এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে থমকে গেছে পুরো কোরবানির আয়োজন।
রুইয়া চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের কোরবানি প্রকল্প সমন্বয়ক কারাম খালেদ জানান, যুদ্ধের আগে প্রতি ঈদে তারা ৩০০ থেকে ৪০০ গরু-ছাগল কোরবানি দিতেন। এবার তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেছেন, ‘যুদ্ধের আগে যে ভেড়ার দাম ছিল প্রায় ৩৫০ ডলার, এখন সেটির দাম দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ডলার পর্যন্ত। ফলে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, দাতব্য সংস্থাগুলোর পক্ষেও কোরবানি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ কারণে জীবিত পশুর বদলে এখন হিমায়িত মাংস বিতরণ করা হচ্ছে।’
বাজারে নেই উৎসবের আমেজ
গাজার বাজারগুলোতেও এবার ঈদের কোনো চেনা রূপ নেই। দোকানে কাপড়, খেলনা ও মিষ্টি সাজানো থাকলেও ক্রেতা নেই বললেই চলে। রমাল এলাকার পোশাক ব্যবসায়ী আমজাদ আকরাম বলেছেন, ‘আগে যে পণ্য আনতে যত খরচ হতো, এখন তার আট গুণ বেশি লাগছে। ফলে পোশাকের দামও অনেক বেড়ে গেছে।’
তিনি জানান, মানুষ এখন নতুন পোশাক কেনার আগে খাবারের চিন্তা করছে। অনেকেই দোকানে এসে শুধু দাম জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছেন।
গাজাজুড়ে এখন ঈদের আনন্দের চেয়ে বেশি শোনা যায় কান্না আর বেঁচে থাকার আর্তনাদ। যুদ্ধবিরতির পর এটি গাজার প্রথম ঈদুল আজহা। অথচ কোথাও নেই উৎসবের উচ্ছ্বাস, নেই শিশুদের হাসি। আছে শুধু ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, ক্ষুধা আর স্বজন হারানোর অন্তহীন বেদনা।












