হরমুজ বন্ধ, বাব আল-মান্দেব বিপন্ন
সুয়েজে আঘাত এলে থমকে যাবে বিশ্ববাণিজ্য?
- ইরান যুদ্ধের নতুন ছায়ায় কাঁপছে মিশরের জীবনরেখা, হুথিদের হাতে বাব আল-মান্দেব বিপন্ন হলে বড় ধাক্কা খেতে পারে দেশটির অর্থনীতি ও বিশ্ববাণিজ্য

ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা, বাব আল-মান্দেবে হুথিদের হুমকি–আর তার পরেই মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে নজিরবিহীন ড্রোন হামলা। পশ্চিম এশিয়ায় বিস্তৃত হতে থাকা ইরান যুদ্ধের অভিঘাত এ বার কি সুয়েজ খাল পর্যন্ত পৌঁছতে চলেছে? মিশরের অর্থনীতি ও বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনীকে ঘিরে সেই আশঙ্কাই ক্রমশ বাড়ছে।
গত ২৯ জুলাই ভূমধ্যসাগরঘেঁষা দামিয়েত্তা বন্দরে ড্রোন হামলায় একটি মার্কিন মালিকানাধীন ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট এবং একটি গ্রিক মালিকানাধীন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায়। অগ্নিনির্বাপণে যুক্ত কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, আগুন ছড়ালে বন্দর এবং পাশের শহরের অংশবিশেষও বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। হামলার দায় এখনও কোনও পক্ষ নেয়নি। তবে মিশরীয় বন্দরে এ ধরনের হামলা এই প্রথম বলে জানিয়েছে দ্য নিউ আরব।
কেন সুয়েজ নিয়ে ভয়
ইরান ও তার ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো ইতিমধ্যে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চাপ তৈরি করেছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথিরা বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে অবরোধের হুমকি দিয়েছে। ফলে পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজে পৌঁছনোর পুরো বাণিজ্যপথই ঝুঁকিতে পড়েছে।
সৌদি আরব হরমুজের বাধা এড়িয়ে পূর্বাঞ্চলের তেল পাইপলাইনে করে ইয়ানবু বন্দরে এনে লোহিত সাগর ও সুয়েজপথে রপ্তানি বাড়িয়েছে। কিন্তু বাব আল-মান্দেবও অরক্ষিত হয়ে পড়লে এই বিকল্প পথটিও বিপন্ন হবে। বড় ট্যাংকারকে কখনও আংশিক বোঝাই অবস্থায় সুয়েজ পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে আবার তেল তুলতে হচ্ছে। এতে যাত্রায় প্রায় এক মাস এবং খরচে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
‘আমরা রপ্তানি না করলে কেউ করবে না’
রাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলমেইডা সোমবার (৩ আগস্ট) দ্য নিউ আরব-কে বলেছেন, দামিয়েত্তার ড্রোন হামলা ইরানের এমন একটি কৌশলের বিস্তার হতে পারে, যার মূল বার্তা, “আমরা রপ্তানি করতে না পারলে অন্য কাউকেও করতে দেওয়া হবে না।”
তাঁর মতে, ড্রোনগুলো ইয়েমেনের চেয়ে পশ্চিম ইরাক থেকে উড়ে আসার সম্ভাবনাই বেশি। ইরাকের আনবার থেকে দামিয়েত্তার সরলরেখার দূরত্ব প্রায় ৯০০ কিলোমিটার; উত্তর ইয়েমেন থেকে তা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার। তবে হুথিরা এর আগেও দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলে হামলার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
আলমেইডা বলেছেন, সৌদি আরবের আবকাইক, জিজান ও ইয়ানবুর ওপর সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইরানের মিত্র গোষ্ঠী ব্যবহার করে সংঘাতকে অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশলের সঙ্গে মেলে। তাঁর সতর্কতা, ইয়ানবু থেকে সুয়েজমুখী ট্যাংকার কিংবা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের অন্য কোনও জ্বালানি স্থাপনাও ভবিষ্যতে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
মিশরের অর্থনীতিতে ‘প্রবল চাপ’
মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের অন্তর্বর্তী নির্বাহী পরিচালক নিকোলাস হেরাস একই প্রতিবেদনে বলেছেন, মিশরের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে ঝুঁকির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তাঁর মতে, হুথিরা লোহিত সাগরকে বিপজ্জনক জলপথে পরিণত করার ইরানি কৌশলে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
হেরাস বলেছেন, এতে সুয়েজবাণিজ্যের ওপর “প্রবল চাপ” পড়বে এবং দুর্বল মিশরীয় অর্থনীতিতে ধারাবাহিক অভিঘাত তৈরি হতে পারে—যা শেষ পর্যন্ত ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়াবে। তাঁর ভাষায়, সুয়েজ লোহিত সাগর দিয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান সংযোগপথ; সেই অঞ্চলে চাপ বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর অসহনীয় বোঝা সৃষ্টি করাই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের লক্ষ্য হতে পারে।
সুয়েজ খালের আয় মিশরের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খালের আয় ২৩ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছলেও জাহাজ চলাচল এখনও আগের স্বাভাবিক পর্যায়ের নিচে রয়েছে। জুনে সুয়েজ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ওসামা রাবি জানিয়েছিলেন, লোহিত সাগরের পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় জাহাজ ফিরছিল এবং বিমার খরচও কমছিল। নতুন উত্তেজনা সেই পুনরুদ্ধারকে ফের থামিয়ে দিতে পারে।
হুথি-ইরান সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ
ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্টের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল-বাশা বলেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর শুরু হওয়া আঞ্চলিক সংঘাতগুলো হুথি ও ইরানের সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। তাঁর মতে, জাতিসংঘে হুথিদের ইয়েমেনের বৈধ কর্তৃপক্ষের মতো উপস্থাপন করা এবং অস্ত্রবাহী নৌকার চলাচল অব্যাহত থাকা—দুই ঘটনাই প্রমাণ করে, যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের সরবরাহ নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
আল-বাশার মতে, হরমুজের গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে বাব আল-মান্দেবও এখন আর দ্বিতীয় সারির জলপথ নয়। প্রতিদিন চীনের উদ্দেশে যাওয়া প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল এই পথের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বাব আল-মান্দেবে চাপ বাড়িয়ে হুথিরা সৌদি আরবের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চাইতে পারে।
সৌদির নৌজোট, সংশয় মিশরের
এই পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে বহুজাতিক নৌজোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব। হেরাসের মতে, জোটটি কার্যকর হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব স্থানীয় মিত্রদের হাতে আরও বেশি তুলে দেওয়ার মার্কিন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। মিশর সেই জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
তবে আলমেইডার সংশয়, সৌদি আরব, মিশর ও তুরস্ক ছাড়া প্রস্তাবিত জোটে বাস্তবে শক্তিশালী নৌবাহিনী খুব কম। তাঁর প্রশ্ন–হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীও বড় ঝুঁকিতে পড়েছে, সেখানে মিশর ও তুরস্ক কতটা সরাসরি সংঘাতে যেতে চাইবে? সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো অভিজ্ঞ শক্তির অনুপস্থিতিও জোটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সুয়েজ এখনও সচল, কিন্তু আশঙ্কা বাড়ছে
সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খালের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনও হামলা হয়নি। গত ৩ মার্চ এক দিনে ৫৬টি জাহাজ খাল অতিক্রম করেছিল। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বড় জাহাজ কোম্পানিগুলোর সাময়িক সরে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু দামিয়েত্তা হামলা একটি নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছে, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের সংকট শুধু দূরের দুই প্রণালীর সমস্যা নয়। যুদ্ধ আরও ছড়ালে মিশরের বন্দর, সুয়েজ খাল ও সুমেদ পাইপলাইনও চাপের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।
তখন বিপদ শুধু মিশরের রাজস্ব হারানো নয়। ইউরোপ-এশিয়ার পণ্য পরিবহন, সৌদি তেল রপ্তানি, জাহাজের বিমা এবং জ্বালানির দাম–সব কিছুতেই একসঙ্গে ধাক্কা লাগবে। ফলে প্রশ্ন এখন একটাই, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবকে চাপে ফেলার পর ইরান যুদ্ধের পরবর্তী সামুদ্রিক লক্ষ্য কি সত্যিই সুয়েজ?






