যেভাবে ১০ মিনিটের ইসরায়েলি হামলায় লন্ডভন্ড লেবানন

৮ এপ্রিল চালানো ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের কর্নিশ আল-মাজরায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের সামনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর হাই এলো সেলোম এখন আর চেনার উপায় নেই। একসময় ঘনবসতিপূর্ণ ও প্রাণচঞ্চল এই এলাকাটি এখন ভেঙে পড়া কংক্রিট, বাঁকানো লোহা আর ছেঁড়া তারের স্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়িঘর পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে, দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা সিঁড়ি। দৈনন্দিন কোলাহলের জায়গায় নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরের বিভিন্ন এলাকায় চলছিল ইসরায়েলের হামলা। তবে ৮ এপ্রিল বিকাল পর্যন্ত এ এলাকাটি তুলনামূলক শান্ত ছিল। বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর খালি করতে বারবার নির্দেশ দিয়ে আসছিল ইসরায়েল। তবে বাসিন্দারা জানান, খুব কম মানুষই হাই এলো সেলোম ছেড়েছিলেন। কারণ যাওয়ার মতো তাদের কোনো জায়গা ছিল না।
সেদিন বিকালে বাড়িতে ঘুমাচ্ছিল মোহাম্মদের ছেলে আব্বাস। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধসে পড়ে তাদের ভবনটি। মোহাম্মদ জানিয়েছেন, ‘আমার ভবনের ওপরের তিনতলা একত্রে ধসে পড়ে। সবকিছু আছড়ে পড়ে আব্বাসের ওপর।’
স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে শুরু হওয়া এ হামলায় স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১০ মিনিট। এই সময়ের মধ্যেই লেবাননের প্রায় ১০০ স্থানে আঘাত হানে ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ)। এই স্বল্প সময়ের ধ্বংসযজ্ঞই এই যুদ্ধে অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে বেশি ক্ষতি ডেকে আনে। ইসরায়েল এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার ও সামরিক স্থাপনার কথা বলা হলেও, নিহতদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন সাধারণ মানুষ।
লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেদিন ৩৬১ জন নিহত হন এবং এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হন।
এটা আমার হারানো দ্বিতীয় বাড়ি
হামলার কয়েক সপ্তাহ পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিবিসি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ বলেছেন, ‘এটা আমার দ্বিতীয় বাড়ি, যা আমি হারালাম। আগের যুদ্ধেও একটি বাড়ি হারিয়েছি, এই যুদ্ধে আরেকটি হারালাম।’
‘ইশ, আমি যদি শুধু বাড়িটাই হারাতাম, আমার ছেলেটা বেঁচে যেত। এই ইট-পাথর তো আবার গড়া যাবে, তবে কোনোকিছুর বিনিময়েই আমার ছেলে ফিরে আসবে না’, বলেছেন ছেলে হারানোর শোকে বিহ্বল এই বাবা।
তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ভবনে যারা মারা গেছেন তারা সবাই বেসামরিক বাসিন্দা। ‘যদি এক শতাংশও সন্দেহ করতাম যে এখানে হিজবুল্লাহর কেউ আছে, আমি এখানে থাকতাম না। আমি আমার ছেলের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতাম না।’
‘যেহেতু আমার বয়স ৪৫ বছর, আমি নিজের ঝুঁকি নিয়ে চিন্তা করতাম না; কিন্তু একজন তরুণ, যার সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে— হিজবুল্লাহর কেউ থাকলে সেই ভবনে আমি তাকে রাখতাম না’, যোগ করেন মোহাম্মাদ।
ছেলের মৃত্যুর পর স্থানীয় গণমাধ্যমে হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন জানিয়ে লেবানন রক্ষার আহ্বান জানান মোহাম্মাদ। একই ধরনের অনুভূতি ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য এলাকায়ও শোনা গেছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ২ মার্চ ইসরায়েলে রকেট ছোড়ে হিজবুল্লাহ। এরপর দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বড় ধরনের অভিযান শুরু হয় এবং হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে জোরদার হয় হামলা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলে ইসরায়েল জানায়, লেবানন এই চুক্তির আওতায় নয়। তবুও মানুষ কিছুটা আশাবাদী ছিলেন। তবে সেই আশা দ্রুত ভেঙে যায় ৮ এপ্রিল।
সব স্তব্ধ হয়ে গেছে
ভিডিও ফুটেজ, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে হাই এলো সেলোমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে হওয়া অন্তত পাঁচটি হামলা শনাক্ত করে বিবিসি। কিছু ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানায়, এখানে হিজবুল্লাহর সদস্য আলি মোহাম্মদ গুলাম দাহিনি নিহত হন। স্মারক পোস্টারেও তাকে হিজবুল্লাহর যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি হামলায় বেসামরিক হতাহতের ব্যাপকতা স্পষ্ট। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই এলাকায় ৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যার মধ্যে রয়েছে অন্তত ১৫ শিশু।
সংকীর্ণ রাস্তার কারণে ব্যাহত হয় উদ্ধার কাজ। স্থানীয়রা জানান, অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন। আকুতি জানাচ্ছিলেন প্রাণ বাঁচাতে।
হামলার পরপরই যাদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল, ঘাসান জাওয়াদ ছিলেন তাদেরই একজন। তার ভবনটি যখন ধসে পড়ে, তিনি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। ‘হঠাৎ নিজেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আবিষ্কার করলাম। ভেবেছিলাম আমি মারা গেছি।’ চারপাশে মানুষ চিৎকার করছিল। ‘আমি প্রার্থনা শুরু করি, কারণ ভেবেছিলাম এটাই শেষ,’ বলেছেন জাওয়াদ।
ঠিক সেই সময়ে ঘটে অলৌকিক এক ঘটনা। ‘আমার বিড়ালটি মাটি খুঁড়তে শুরু করল। ও ছোট একটি গর্ত খুঁড়ল, যাতে আমি শ্বাস নিতে পারি।’ কিছু সময় পর মানুষের কণ্ঠ শুনতে পান তিনি, তাকে উদ্ধারে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁড়তে শুরু করেন প্রতিবেশীরা।
‘তারা হাতুড়ি-শাবল দিয়ে খুঁড়ে আমাকে বের করে আনেন। তবে অন্যরা প্রাণে বাঁচেনি।’ জাওয়াদের মা, দুই বোন ও সন্তানরা প্রাণ হারিয়েছেন এই হামলায়। ‘আমি শুনলাম আমার মা আমার পাশে প্রার্থনা করছেন, তারপর তার কণ্ঠস্বর থেমে গেল।’
একযোগে হামলা
একই সময়ে বৈরুতের কেন্দ্রীয় এলাকা কর্নিশ আল মাজরাতেও হামলা হয়। সেদিন দুপুর ২টা ১৫ নাগাদ চলছিল জিম ক্লাস, রেস্টুরেন্টে প্রস্তুত হচ্ছিল খাবার, চুল কাটা চলছিল সেলুনে। হঠাৎ কোনো সতর্কতা ছাড়াই হয় বিস্ফোরণ, প্রাণ হারান ১৬ জন। প্রথম এই এলাকায় হামলা চালায় ইসরায়েল।
হামলার সময় একটি ভবনের সাততলায় কাজ করছিলেন নোহা নামে এক ফিটনেস প্রশিক্ষক। তিনি আগে দূর থেকে হামলা দেখেছেন, কিন্তু তার শহরে হামলা হবে, কখনো ভাবেননি তিনি। ‘আমরা কোনো সতর্কতা পাইনি। বাইরে তাকিয়ে দেখি চারপাশ অন্ধকার, রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে মানুষ।’
এই এলাকায় কেন হামলা হলো— সেই প্রশ্ন নোহার মনে। ‘এটি ছিল বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু। আমরা সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’ এই এলাকায় হিজবুল্লাহর কোনো উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
এই জিমের এক মাইলের ভেতর আরও অন্তত চারটি হামলা হয়েছে। ওই ১০ মিনিটের মধ্যেই দেশজুড়ে চলছিল হামলা। উত্তরের হারমেল থেকে শুরু করে বেকা উপত্যকা পেরিয়ে সুদূর দক্ষিণের গ্রামগুলো পর্যন্ত প্রায় একই সময়ে একই ধরনের হামলা হচ্ছিল।
পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই হামলার শিকার হয় দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সিডন। হামলায় হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট আল জাহরা ধর্মীয় কমপ্লেক্সটি মিশে যায় মাটির সঙ্গে। সেখানে একসঙ্গে নিহত হন দুই বোন রহমা (২৭) ও রায়ান (২২)। তাদের মা কাওকাব জানিয়েছেন, ‘ওরা নামাজ পড়তে গিয়েছিল। এর আধা ঘণ্টার মধ্যেই হামলা হয়।’ নিরাপত্তার জন্য এখানে এসেছিলাম।
এই হামলায় আল জাহরার ইমাম শেখ সাদিক নাবুলসি নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর সঙ্গে তার গভীর আদর্শিক ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিল, যদিও তিনি নিজে কোনো আনুষ্ঠানিক পদে ছিলেন না। এখানে নিহত মোহাম্মদ মা'আনি ছিলেন হিজবুল্লাহর যোগাযোগ ও সমন্বয় ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তবে নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক বলে প্রমাণ মিলেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ২৫০ জন হিজবুল্লাহ সদস্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যদিও পূর্ণ তালিকা দেয়নি। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, নিহতদের বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ।
বেসামরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসরায়েল জানায়, তারা ‘ক্ষতি কমাতে ব্যাপক চেষ্টা’ করেছে। তাদের দাবি, লক্ষ্যবস্তুগুলো বেসামরিক এলাকার ভেতরে ছিল এবং হিজবুল্লাহ মানবঢাল হিসেবে এসব এলাকা ব্যবহার করে।
হিজবুল্লাহ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ইসরায়েল বেসামরিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই হামলা চালায়।
৮ এপ্রিল মাত্র ১০ মিনিটে ১০০টি স্থানে চালানো হামলা লেবাননের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিনের একটি হয়ে উঠেছে। লেবাননে দিনটি পরিচিতি পেয়েছে ‘ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে’ হিসেবে।
বিবিসি থেকে অনূদিত, ভাষান্তর: এস এম আজিজুর রহমান।












