সমালোচনায় ভাইরাল ভারতের ‘লিভার ডাক্তার’

বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে বিভক্ত মতামতের কেন্দ্রে পরিণত হন ডা. সাইরিয়াক অ্যাবি ফিলিপস। ছবি: বিবিসি
সামাজিক মাধ্যমে তিনি তুমুল বিতর্কিত। হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদের কড়া সমালোচনায় তার বিরুদ্ধে হয়েছে একের পর এক মামলা।
কিন্তু হাসপাতালের কক্ষে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। ধৈর্য নিয়ে রোগীর কথা শোনেন, চিকিৎসা দেন সহানুভূতির সঙ্গে।
বিজ্ঞানের পক্ষে আপসহীন অবস্থানই তাকে করে তুলেছে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত লিভার বিশেষজ্ঞদের একজন।
ভারতের কেরালার কোচির রাজাগিরি হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের অপেক্ষাকক্ষ যেন আশা আর হতাশার মাঝামাঝি এক পৃথিবী। কেউ শেষ ভরসা নিয়ে চিকিৎসকের অপেক্ষায়, আবার কেউ পুরোনো চিকিৎসা নথি আঁকড়ে ধরে বসে আছেন প্রিয়জনকে বাঁচানোর আশায়।
এই ব্যস্ততার মাঝেও চিকিৎসক ডা. সাইরিয়াক অ্যাবি ফিলিপসকে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, ধৈর্য নিয়ে প্রশ্ন করেন, তারপর সহানুভূতির সঙ্গে রোগের বাস্তবতা ও ব্যাখ্যা করেন পরবর্তী করণীয়। সামাজিক মাধ্যমে তার আক্রমণাত্মক উপস্থিতির সঙ্গে যেন কোনো মিলই নেই এই মানুষটির।
ভারতে ‘লিভার ডক’ নামে পরিচিত ডা. ফিলিপসের এক্স অ্যাকাউন্টে অনুসারী তিন লাখের বেশি। সেখানে তিনি হোমিওপ্যাথিকে ‘ভুয়া চিকিৎসা’ এবং কঠোর সমালোচনা করেন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির। তার এই অবস্থানের কারণে তিনি যেমন প্রশংসিত, তেমনি ব্যাপক সমালোচিতও।
বিকল্প চিকিৎসা নিয়ে তার সমালোচনার জেরে ভারতের আয়ুষ মন্ত্রণালয় দুটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে তাকে নিয়ে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টের জেরে উত্তর প্রদেশ থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তা আসেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেও। গত ছয় বছরে তার বিরুদ্ধে ১৬টি আইনি মামলা হয়েছে, যার কয়েকটি এখনো বিচারাধীন।
তবে হাসপাতালের সহকর্মী, দীর্ঘদিনের রোগী এবং পরিচিত চিকিৎসকদের ভাষ্য, বাস্তব জীবনে ডা. ফিলিপস অত্যন্ত বিনয়ী, শান্ত ও ভদ্র মানুষ।
নিজের অনলাইন আচরণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘অনেকে আমাকে ঘৃণা করেন। কিন্তু আমি যে তথ্য দিই, তা ভুল প্রমাণ করতে পারেন না। কখনো কখনো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে জোরে কথা বলতে হয়।’
আয়ুর্বেদ ও অ্যালকোহলজনিত লিভারের ক্ষতিই তার গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র। তার মতে, কোনো চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত না হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে মানুষের জন্য।
অবশ্য চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল না তার। লেখক হতে চেয়েছিলেন তিনি। সিনেমার প্রতিও ছিল প্রবল আগ্রহ। কিন্তু খ্যাতনামা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বাবা ডা. ফিলিপ অগাস্টিনের ছেলে হওয়ায় চিকিৎসাবিদ্যাতেই পা রাখতে হয় তাকে।
প্রথমবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় চেষ্টায় ভর্তি হন বেঙ্গালুরুর সেন্ট জনস মেডিকেল কলেজে। বেপরোয়া জীবনযাপনও করেছেন ছাত্রজীবনে। একসময় অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নিজের অধ্যাপকের অধীনেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাকে।
চিকিৎসা পেশার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায় কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে এমডি করার সময়। ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও জনবলের সংকটের মধ্যেও চিকিৎসকদের নিরলস সেবা গভীরভাবে নাড়া দেয় তাকে।
পরবর্তী সময়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন দিল্লির ইনস্টিটিউট অব লিভার অ্যান্ড বিলিয়ারি সায়েন্সেসে হেপাটোলজিতে। পরে কেরালায় ফিরে তিনি দেখতে পান, অ্যালকোহল এবং নিয়ন্ত্রণহীন ভেষজ ওষুধ ব্যবহারের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অসংখ্য রোগীর লিভার।
একটি ঘটনা সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় তাকে। জ্বর ও সর্দির জন্য ঘরোয়া ভেষজ মিশ্রণ খাওয়ানোর পর ছয় বছরের এক শিশু তীব্র জন্ডিস ও লিভার বিকল হয়ে আসে হাসপাতালে। দীর্ঘ চেষ্টার পরও বাঁচানো যায়নি শিশুটিকে।
এরপর থেকেই বিকল্প চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণায় মনোযোগী হন তিনি। গবেষণালব্ধ তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করেন সামাজিক মাধ্যমে। শুরুতে তেমন সাড়া না পেলেও পরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয় তার পোস্টগুলো।
তার বক্তব্য, ‘আমি কোনো চিকিৎসককে প্রতারক বলি না। আমি বলি, যেসব নীতির ওপর এসব চিকিৎসাপদ্ধতি দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান নিজের ভুল সংশোধন করে। বিকল্প চিকিৎসায় সেই মানসিকতা নেই।’
এ পর্যন্ত ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ওষুধে লিভারের ক্ষতি নিয়ে একাধিক গবেষণা প্রকাশ করেছেন তিনি। আয়ুষ মন্ত্রণালয় তার একটি গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন তুললে বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তার জবাব দেন।
চিকিৎসক হিসেবে সহজ নয় তার কাজও। প্রতিদিনই তাকে এমন রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয়, যাদের অনেকেরই শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়। তার ভাষায়, ‘সব রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। তখন আমাদের দায়িত্ব হয়, যেন রোগী মর্যাদার সঙ্গে শেষ সময়টা পার করতে পারেন এবং পরিবার বিষয়টি বুঝে নিতে পারে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘মানুষ মনে করে চিকিৎসকেরা সব সময় শক্ত থাকেন। বাস্তবে তা নয়। অসংখ্য মৃত্যু সনদে সই করার পরও প্রতিটি মৃত্যু আমাকে স্পর্শ করে।’
কয়েক বছর আগে গুরুতর এক সড়ক দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। এরপর থেকে রোগী দেখার সংখ্যা কমিয়ে সীমিত রেখেছেন প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২৫ জনে। চার বছর আগে নিজেও মদ্যপান সম্পূর্ণ ছেড়ে দেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘আমি যদি নিজেই মদ খাই, তাহলে রোগীদের কীভাবে মদ ছাড়তে বলব?’
সব বিতর্ক, মামলা ও হুমকির মধ্যেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নন ডা. সাইরিয়াক ফিলিপস। তবে পরিবারের প্রসঙ্গ উঠতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
তিনি বলেছেন, ‘আমি চাই আমার সন্তানরা আমাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে মনে রাখুক। যে নিজের বিশ্বাসের পক্ষে শেষ পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।’
সূত্র: বিবিসি







