দিল্লির পর ঝাড়খণ্ডেও জেন-জির জয়
- টানা ২৫ দিনের ছাত্র আন্দোলনে এবার নতি স্বীকার রাজ্যের ইন্ডিয়া জোট সরকারের, বাতিল নিয়োগ পরীক্ষা

আন্দোলনকারীরা পরীক্ষাগুলি বাতিলের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেন।
দিল্লির পর এবার ঝাড়খণ্ডেও জয়জয়কার ভারতের জেন-জিদের। দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলনের চাপে পড়ে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিল সরকার। সোমবার সন্ধ্যায় এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে রাজ্যের ইন্ডিয়া জোট সরকার। এর আগে টানা ৪৯ দিন বিক্ষোভের পর (২৫ জুলাই) জেন-জিদের দাবি রক্ষায় পদত্যাগে বাধ্য হন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়াম থেকে ২৫ জুলাই শুরু হওয়া এই আন্দোলন মূলত ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। টানা আন্দোলন, অনশন, বিধানসভা অভিযান এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের পর এদিন সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে বড় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। জানালেন, ২০২৪ সালের ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের সম্মিলিত স্নাতক স্তরের পরীক্ষা বাতিল করেছে সরকার। একই সঙ্গে ২০১৪ সাল থেকে টিএসআর ডেটা প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে নেওয়া সব নিয়োগ পরীক্ষা, প্রকাশিত ফল ও সেই পরীক্ষার ভিত্তিতে হওয়া নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম বা গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে এবং তদন্তের কথাও জানিয়েছে ঝাড়খণ্ড সরকার।
আন্দোলনকারীদের অন্যতম মুখ তথা ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো টানা ১৬ দিন অনশন করেন। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর তিনি অনশন প্রত্যাহার করে এটিকে ঝাড়খণ্ডের ছাত্রসমাজের জন্য বড় জয় বলে দাবি করেন। তবে তার বক্তব্য, অনশন শেষ হলেও স্বচ্ছ নিয়োগের দাবির লড়াই কিন্তু শেষ হয়নি। এই আন্দোলনের পথে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতও হয়। ১০ আগস্ট বিধানসভা অভিযানে পুলিশ ছাত্রদের ওপর নির্মমভাবে জলকামান, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও লাঠি ব্যবহার করে। এতে বহু ছাত্র আহত হন। অসুস্থ অবস্থায়ও অ্যাম্বুলেন্সে চেপে মিছিলে যোগ দেওয়া দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো পরে রাঁচির সদর হাসপাতালে ভর্তি হন।
ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের সমর্থনও মিলেছে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাত্রদের দাবির পাশে থাকার কথা জানায়। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে প্রথমে ভিডিওকলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরে তার দলের একটি প্রতিনিধিদল ৮ আগস্ট রাঁচিতে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করে মনোবল জোগায়। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী নেহা বোরাও রাঁচিতে গিয়ে অনশনরত ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করেন। উল্লেখ্য, ৭ আগস্ট আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সময় তার দিকে কালি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় এক ব্যক্তিকে আটক করা হয় এবং পরে আদালত তাকে জামিন দেন।
এর মধ্যেই গত রবিবার রাহুল গান্ধী মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে চিঠি লিখে আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি ছাত্রদের দাবিকে ন্যায্য এবং আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। পরে সমঝোতার মাধ্যমে অনশন শেষ হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে রাহুল বলেন, ‘ছাত্ররা প্রশ্ন করলে জবাব পাওয়া উচিত— এটিই সঠিক পথ।’ তবে আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি, অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সিবিআই তদন্ত এখনো পূরণ হয়নি। ফলে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তে বড় জয় এলেও ঝাড়খণ্ডের ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তী অধ্যায় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
তবে দিল্লির পর ঝাড়খণ্ডের এই আন্দোলনও দেখিয়ে দিল, নিজেদের ভবিষ্যৎ ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে জেন-জি আর পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। দীর্ঘ অনশন, রাস্তায় নেমে আন্দোলন এবং চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সরকারের নতি স্বীকার— সেই আন্দোলনেরই ফল। তাই ঝাড়খণ্ডে জেন-জির এই জয় শুধু একটি পরীক্ষা বাতিলের জয় নয়, তাদের প্রশ্ন করার গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সরকারের কাছে জবাবদিহির দাবিতে তরুণ প্রজন্মের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও।






