ভারতে সিইসি বিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই প্রকাশ্যে নির্বাচন কমিশনের নজিরবিহীন মতবিরোধ

সংগৃহীত ছবি
ভারতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বাতিলের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ চলছে। এরই মধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) অভ্যন্তরীণ নজিরবিহীন মতবিরোধ। কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার ড. সুখবীর সিং সান্ধু ও ড. বিবেক যোশি ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিব টিভি সোমনাথনকে পৃথক চিঠি লিখে কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে আপত্তি জানান এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। দেশটির তথ্য অধিকার আইনে (আরটিআই) প্রকাশিত নথিতে উঠে এসেছে এ তথ্য।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে লেখা চিঠি দুটি কমিশনের জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার মনীশ গার্গ এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন পুনর্নির্ধারণ করে তার জারি করা একটি আদেশকে কেন্দ্র করে। দুই কমিশনারের অভিযোগ, কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগাম আলোচনা না করেই দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্যেই এ ঘটনা সামনে এল। গত ২৩ সেপ্টেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি ও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিয়ে ১০ মাসে ১৪ বার লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। ভোটার তথ্যভান্ডারের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তারা মন্ত্রিপরিষদ সচিবেরও দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
তবে আরটিআই আবেদনের মাধ্যমে প্রকাশিত এই চিঠিপত্রের বিষয় ছিল আলাদা—কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন।
নিজের চিঠিতে সান্ধু জানান, উপনির্বাচন কমিশনার ভানু প্রকাশ ইয়েতুরুর ছুটির সময়ে ২৮ জুলাই প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় গার্গকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিকল্প কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার, উপনির্বাচন কমিশনার, মহাপরিচালক ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন সংশোধন করে আদেশ জারি করেন তিনি।
সান্ধু চিঠিতে লেখেন, ‘দায়িত্ব বণ্টনে এই সংশোধনের বিষয়ে কমিশন বা নিম্নস্বাক্ষরকারীকে আলোচনা করে জানানো হয়নি।’
তিনি অভিযোগ করেন, গার্গ নিজের ওপরও দায়িত্ব বণ্টন করেছেন। পাশাপাশি নিজের চেয়ে জ্যেষ্ঠ বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন। প্রশাসন বিভাগের উপনির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ও গার্গ একই ধরনের আদেশ জারি করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন সান্ধু।
তিনি লেখেন, ‘কমিশনের সঙ্গে আগাম আলোচনা বা অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ না নিতে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে নিম্নস্বাক্ষরকারীর পক্ষ থেকে বারবার স্পষ্ট মৌখিক ও লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এমন ঘটনা ঘটেছে।’
সান্ধুর অভিযোগ, গার্গের এ পদক্ষেপ ২০২৩ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদ) আইনের ১৮(১) ও ১৮(২) ধারা লঙ্ঘন করেছে। এ ঘটনায় ‘যথাযথ ব্যবস্থা’ নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
পৃথক চিঠিতে একই ধরনের আপত্তি জানান যোশিও। তিনি বলেন, কমিশনের সঙ্গে আলোচনা না করে এবং তাকে না জানিয়েই দায়িত্ব বণ্টন সংশোধনের আদেশ জারি করেছেন গার্গ। এ ছাড়া প্রশাসন বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট নথি চেয়েও তিনি তা পাননি বলে অভিযোগ করেন যোশি।
তিনি লেখেন, ‘এ ছাড়া, নিম্নস্বাক্ষরকারী প্রশাসন বিভাগের কাছে সংশ্লিষ্ট নথি চাইলেও তা সরবরাহ করা হয়নি।’
কমিশনের আগাম আলোচনা বা অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে দেওয়া নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেন যোশি। তাঁর অভিযোগ, গার্গের পদক্ষেপ ২০২৩ সালের আইন লঙ্ঘন করেছে।
দুই কমিশনারের অভিযোগ সরাসরি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানোর বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বিরোধটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের একটি নথিতে চিঠি দুটির গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও কমিশনের সামগ্রিক অবস্থান জানিয়ে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ না থাকলে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়।
নথিতে সুপারিশ করা হয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব যেন চিঠি দুটি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জবাব দেন এবং সেগুলোর অনুলিপি কর্মী ও প্রশিক্ষণ দপ্তরের (ডিওপিটি) সচিব, এস্টাবলিশমেন্ট অফিসার এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রধান ব্যক্তিগত সচিবের কাছে পাঠান।
এতে আরও বলা হয়, সর্বভারতীয় পরিষেবার কর্মকর্তা এবং মন্ত্রিপরিষদের নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গার্গের বিষয়ে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিবেচনার জন্য বিষয়টি নথিভুক্ত রাখা যেতে পারে।
২০২৬ সালের ৫ আগস্ট দুই কমিশনারের চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সান্ধুকে পাঠানো জবাবে সোমনাথন লেখেন, ‘কমিশনে জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার ও আইএএস কর্মকর্তা শ্রী মনীশ গার্গের (এইচপি: ১৯৯৬) কার্যক্রম সম্পর্কে ২৯ জুলাই, ২০২৬ তারিখে পাঠানো আপনার ডি.ও. চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করছি।’
যোশিকেও একই ধরনের জবাব পাঠানো হয়। এর অনুলিপি দেওয়া হয় ডিওপিটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দপ্তরে।
তবে আরটিআইয়ের জবাবে দেওয়া নথিতে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার পর কোনো তদন্ত বা পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রকাশিত নির্বাচন কমিশনের নথিতে দেখা যায়, ইয়েতুরু ছুটিতে থাকাকালে গার্গকে প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২৮ জুলাইয়ের একটি দাপ্তরিক আদেশে বলা হয়, ২৭ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে ইয়েতুরুর দায়িত্বগুলো দেখভাল করবেন গার্গ। একই দিনে জারি করা পৃথক আদেশে কমিশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন সংশোধন করা হয়।
অবসরপ্রাপ্ত কমোডর লোকেশ কে. বাত্রা ২৪ সেপ্টেম্বর আরটিআই আবেদনটি করেন। কমিশনারদের চিঠির অনুলিপি, মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের নেওয়া পদক্ষেপের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট নথির মন্তব্য বা নোটিং চেয়েছিলেন তিনি। নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় তাঁকে ১৪ পৃষ্ঠার নথি সরবরাহ করে।
প্রকাশিত নথিতে নিশ্চিত হয়েছে, দুই কমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে তাদের আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং চিঠি দুটি গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে অভিযোগের বিষয়ে এরপর আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নথিতে স্পষ্ট নয়।
সূত্র: এনডিটিভি




