কেন ছোট দলে নাম লেখাচ্ছেন তৃণমূলের বড় নেতারা?

এনসিপিআই যোগ দিচ্ছেন তৃণমূলের নেতারা- প্রতিনিধি
তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের নতুন রাজনৈতিক গন্তব্য নিয়ে কয়েকদিন ধরেই জোর জল্পনা চলছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তারা সরাসরি বিজেপির পতাকার তলায় চলে যাবেন। কিন্তু সেই জল্পনায় জল ঢেলে দিয়ে তারা বেছে নিয়েছেন অপেক্ষাকৃত অচেনা অজানা এক রাজনৈতিক দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়াকে (এনসিপিআই)। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই কানাঘুষো চলছে, জাতীয় রাজনীতিতে প্রায় অদৃশ্য একটি দল হঠাৎ করে কেন বিদ্রোহী সাংসদদের পছন্দের ঠিকানা হয়ে উঠল?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ আইনি হিসাব। দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আওতায় সরাসরি অন্য দলে যোগ দিলে সাংসদ পদ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারত। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, লোকসভায় তৃণমূলের মোট ২৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জন তাদের সঙ্গে রয়েছেন। সেই কারণে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পথকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে মনে করা হয়েছে। এই হিসাব থেকেই এনসিপিআইয়ের সঙ্গে হাত মেলানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এনসিপিআই নামটি এতদিন জাতীয় রাজনীতিতে প্রায় অজানা ছিল বললেই চলে। ২০২৩ সালে দলটি রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে। ত্রিপুরা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি এলাকায় সীমিত সাংগঠনিক কার্যকলাপ থাকলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি। এমনকি ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা খুব অল্প ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহী সাংসদদের যোগদানের ফলে এক লাফে জাতীয় আলোচনার শিরোনামে উঠে এসেছে দলটি।
সূত্রের দাবি, বিদ্রোহী সাংসদদের সামনে একাধিক বিকল্প ছিল। কিন্তু তারা এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম খুঁজছিলেন, যেখানে একদিকে নিজেদের পৃথক পরিচয় বজায় রাখা যাবে, অন্যদিকে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও থাকবে। এনসিপিআই সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। দলটির নেতৃত্বও বিদ্রোহীদের স্বাগত জানিয়েছে এবং এনডিএর সঙ্গে সমন্বয়ের বার্তা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে বাংলার ভোট-সমীকরণও কাজ করেছে। দীর্ঘদিন তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে হঠাৎ বিজেপিতে যোগ দিলে রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হত। বিরোধীরা তাদের বিরুদ্ধে ‘জনমতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ আরও জোরালোভাবে তুলত। সেই তুলনায় একটি পৃথক রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে নতুন পথচলা শুরু করলে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা সহজ হবে বলে মনে করেছেন বিদ্রোহী নেতারা।
এদিকে বিদ্রোহী সাংসদদের তরফে ইতিমধ্যেই স্পিকারের কাছে পৃথক পরিচয় ও আলাদা আসন বিন্যাসের আবেদন জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, তারা সংসদে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করতে চান। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে এনসিপিআইয়ের সাংগঠনিক বিস্তার ঘটানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। শীঘ্রই রাজ্যে দলের নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হতে পারে বলে সূত্রের খবর। শতাব্দী রায় বললেন, আমরা এনসিপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করা হবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্কও কম নয়। তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, যে প্রতীকে ভোটে জিতে সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেই দল ছেড়ে অন্য রাজনৈতিক শিবিরে চলে যাওয়া ভোটারদের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলে।
অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তারা দলের বর্তমান নেতৃত্বের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, ভোটারদের স্বার্থেই নতুন রাজনৈতিক পথ বেছে নিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমেও এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, বিদ্রোহী সাংসদরা আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এনসিপিআইকে বেছে নিয়েছেন। আবার অনেকের প্রশ্ন, এতদিন যে দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বই প্রায় ছিল না, সেই দল হঠাৎ করে ২০ জন সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিত্ব করবে কীভাবে? কেউ কেউ কটাক্ষ করে লিখেছেন, ত্রিপুরার ছোট দল এক লাফে দিল্লির বড় খেলোয়াড় হয়ে গেল। আবার অন্যদের মতে, রাজনীতিতে সংখ্যা সবকিছু বদলে দিতে পারে, এনসিপিআই তার সাম্প্রতিক উদাহরণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের কাছে এনসিপিআই শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং তৃণমূল থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের নতুন রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলার একটি কৌশলগত মঞ্চ। সেই মঞ্চ ভবিষ্যতে কতটা শক্তিশালী হবে, এখন সেদিকেই নজর দেশের রাজনৈতিক মহলের।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার বললেন, আমরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এনডিএর সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করব। এছাড়াও আমরা আলাদা বসার আবেদন জানিয়েছি। আমাদের শক্তি লোকসভায় তৃণমূলের মোট সাংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। আবার সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই সুরে কথা বলেন এবং প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বাধীন এনডিএর সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করার ঈঙ্গিত দেন।
অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর এক সদস্য বলেছেন, আমরা কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, একটি রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। আগামী দিনে মানুষের কাছে আমাদের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করব।
কলকাতার সমাজসেবক এবং মানবাধিকার কর্মী শুভম দাসের কথায়, ২০ জন সংসদ সদস্য একসঙ্গে নতুন দলে যাচ্ছেন, এটা অবশ্যই বড় রাজনৈতিক ঘটনা। তবে মানুষ শেষ পর্যন্ত কাজ দেখেই বিচার করবে।




