জেন জি ভোটারই কি বদলাবে ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ?

ভারতে নিট কেলেঙ্কারির পর জেন জিদের দাবির কাছে নতি শিকার করে কেন্দ্রীয় মোদি সরকার।
ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। এটি শুধু নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আসা নয়। রাজনীতি, প্রচার এবং জনমত গঠনের প্রচলিত পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসছে। সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনার কেন্দ্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। জেন জি বা তরুণ ভোটাররা কি আগামী দিনের নির্বাচনের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে চলেছেন?
বিশ্লেষকদের মতে, ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি আপাতত নিজেদের একটি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবেই রাখতে চায়। তবে তাদের ভবিষ্যৎ আন্দোলনও কি একইভাবে জনসমর্থন পাবে? তারা কি একসময় স্বীকৃত রাজনৈতিক দলে পরিণত হবে? আর যদি তা নাও হয়, তাহলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন কিংবা তার আগের বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের প্রভাব কতটা পড়তে পারে, সেই প্রশ্নও এখন আলোচনায়।
নেপালে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সিদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশেরও বেশি। সরকার বিরোধী তরুণদের আন্দোলনের জেরে সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয় এবং চলতি বছরের আকস্মিক নির্বাচনে যুব নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টি’ ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে। বাংলাদেশেও ছাত্র আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়। একইভাবে শ্রীলঙ্কায় ‘আরাগালয়া’ আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিকে সরিয়ে দিয়ে অনুরা কুমার দিসানায়েকের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করে।
ভারতেও তরুণ ভোটারদের প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। ২০২৪ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২১ কোটি। এটি মোট ভোটারের প্রায় ২২ শতাংশ। আবার ৪০ বছরের নিচে সব ভোটারকে ধরলে সেই সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে যায়।
তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ৫ কোটি ৭৩ লক্ষ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪১.৫ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়। ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’-র নির্বাচনী সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রথমবার ভোট দেওয়া নাগরিকদের ৬৮ শতাংশ মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের দল টিভিকে-এর পক্ষে সমর্থন দেন। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে এই সমর্থন ছিল ৫৯ শতাংশ এবং ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ। বিপরীতে, ৪০ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে টিভিকে-র জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
সমীক্ষাটি আরও একটি প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। অনেকেই মনে করেছিলেন, শুধুমাত্র কম শিক্ষিত বা চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের সমর্থনেই বিজয় জয়ী হয়েছেন। কিন্তু তথ্য বলছে, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ থেকে শুরু করে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পেশাগত ডিগ্রিধারী ভোটারদের মধ্যেও টিভিকে এগিয়ে ছিল। কেবল নিরক্ষর এবং নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী দ্রাবিড় দলগুলি এগিয়ে ছিল। এই ফলাফলের পর তামিলনাড়ুর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের প্রচার কৌশল বদলাতে শুরু করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি শাখাকে আরও সক্রিয় করা, সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গচিত্র এবং রিলস-শর্টস নির্মাণ সহ তরুণদের জন্য আলাদা কর্মসূচি নেওয়ার মতো পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি তার মন্ত্রীদের সামাজিক মাধ্যমে আরও সক্রিয় হতে এবং বেশি আকর্ষণীয় ছোট ভিডিও প্রকাশের পরামর্শ দিয়েছেন। এটিও রাজনৈতিক প্রচারের পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে বিজেপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে বিজেপির ভোটের হার প্রায় ২ শতাংশ কমেছে, আর একই সময়ে কংগ্রেসের সমর্থন বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ। ২০১৪ সালে যে তরুণদের বিপুল সমর্থন নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় এনেছিল, এক দশক পর সেই তরুণদের রাজনৈতিক পছন্দ বদলানোর ইঙ্গিতই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভারত আজ শুধু নতুন ভোটারের আগমনই প্রত্যক্ষ করছে না। ভারত এমন এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে, যেখানে ডিজিটাল প্রজন্মের চিন্তা, যোগাযোগের ধরন এবং প্রত্যাশাই ভবিষ্যতের নির্বাচনী সমীকরণ নির্ধারণ করতে পারে। তরুণদের এই পরিবর্তিত মনোভাবকে যে দল সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারবে, আগামী দিনের রাজনীতিতে তারাই এগিয়ে থাকবে।




