অরুণাচল নিয়ে চিনকে কড়া জবাব ভারতের
- ২৭টি জায়গাকে মানচিত্রে জুড়ল ভারত

সীমান্তে শুধু সেনা ও পরিকাঠামো নয়, ভৌগোলিক নামও এখন ভারত ও চিনের কূটনৈতিক টানাপড়েনের অংশ। অরুণাচল প্রদেশকে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে বেজিং। আর সেই দাবিকে জোরালো করতে একাধিকবার রাজ্যটির বিভিন্ন জায়গার নাম বদলে নিজেদের মানচিত্রে প্রকাশ করেছে চিন। নয়াদিল্লিও প্রতিবারই সেই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, নাম বদলে কোনও এলাকার মালিকানা বা ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলানো যায় না। এ বার সেই একই কৌশলের পাল্টা জবাব দিতে অরুণাচল প্রদেশের এলএসি (Line of Actual Control) সংলগ্ন ২৭টি জায়গাকে ভারতের সরকারি মানচিত্রে নির্দিষ্ট নাম দিয়ে চিহ্নিত করল কেন্দ্র সরকার। সার্ভে অব ইন্ডিয়ার প্রকাশিত অরুণাচল প্রদেশের নতুন মানচিত্রে এই নামগুলি যুক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রের বক্তব্য, এর লক্ষ্য সীমান্তবর্তী এলাকাগুলির সঠিক নাম ও পরিচিতি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই এই ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে ২১টি বসতি বা জনবসতিপূর্ণ এলাকা, চারটি গিরিপথ, একটি হ্রদ এবং একটি স্মৃতিস্তম্ভ। তালিকাভুক্ত এলাকাগুলির মধ্যে রয়েছে লংজু, মাজা, বিসা, বড়া কুন্দুন, ছোটো কুন্দুন, ধানবাড়ি, প্রীতনগর, বুদ্ধমন্দির, জয়রামপুর, তেরিতনগর, রামনগর, যশবন্ত গড়, সাগর, পদ্মা, জ্যোতিনগর, বৈশাখী, ছোটো রোপুক, বড়া রোপুক, শিবাজিনগর, সুনপুরা এবং কামলাং নগর।
এই তালিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম লংজু। সীমান্তের অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই এলাকা নিয়ে ভারত ও চিনের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ভারত লংজুকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। কিন্তু ১৯৫৯ সাল থেকে এলাকাটি চিনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন মানচিত্রে লংজুর নাম অন্তর্ভুক্ত করা তাই কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, সীমান্তের উপর ভারতের দাবিরও একটি স্পষ্ট বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।
এর পিছনে রয়েছে চিনের দীর্ঘদিনের নামকরণ কৌশল। ২০২৪ সালের মার্চে বেজিং অরুণাচল প্রদেশের আরও ৩০টি জায়গার তথাকথিত ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজড’ নাম প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকায় ছিল ১১টি বসতি, ১২টি পাহাড়, চারটি নদী, একটি হ্রদ, একটি গিরিপথ এবং একটি ভূমিখণ্ড। চিন অরুণাচলকে ‘জ়াংনান’ বা ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে দাবি করে। এর আগেও ২০১৭, ২০২১ এবং ২০২৩ সালে একই ধরনের নামকরণের তালিকা প্রকাশ করেছিল বেজিং।
কিন্তু সে সময়ও চিনের সেই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছিল ভারত। নয়াদিল্লির বক্তব্য ছিল, কোনও জায়গার নাম পাল্টে দিলেই তার ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক অবস্থান বদলে যায় না। ২০২৫ সালেও চিন ফের অরুণাচলের একাধিক জায়গার নাম পরিবর্তনের চেষ্টা করলে ভারত একই অবস্থান নেয় এবং জানায়, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সীমান্ত নিয়ে ভারত ও চিনের বিরোধ নতুন নয়। ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত প্রশ্ন অমীমাংসিত। প্রায় ৩,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সম্পূর্ণ ঐকমত্য নেই। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে সেনা প্রত্যাহার ও উত্তেজনা কমানোর জন্য একাধিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে, সীমান্ত সংক্রান্ত বিরোধ এখনও পুরোপুরি মেটেনি।
এই পরিস্থিতিতে অরুণাচলের ২৭টি জায়গাকে ভারতের সরকারি মানচিত্রে নির্দিষ্ট নাম দিয়ে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্তকে সীমান্তে ‘মানচিত্র যুদ্ধ’- এর পাল্টা কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে এই বিষয়ে চিনের প্রতিক্রিয়া এখনও মেলেনি। তবে অরুণাচল নিয়ে একই ধরনের নামকরণ প্রসঙ্গে চলতি বছরের এপ্রিলে বেজিং দাবি করেছিল যে , ‘জ়াংনান’ চিনেরই ভূখণ্ড এবং ওই এলাকার স্থানগুলির সরকারি নাম নির্ধারণের অধিকার চিনের রয়েছে। নয়াদিল্লি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিল এই ধরনের নাম বদল ভারতের ভূখণ্ডগত বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারে না।




