মীর জাফরের বংশধরদের বাড়িতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার ছবি!

সংগৃহীত ছবি
ভারতীয় উপমহাদেশে ‘মীর জাফর’ শব্দটি আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয় বিশ্বাসঘাতক বা গাদ্দারের প্রতিশব্দ হিসেবে। আড়াই শতাব্দী পার হলেও মানুষ এই নামটিকে এখনও স্মরণ করে ঘৃণাভরে। যা তার বংশধরদের বর্তমান প্রজন্মের ওপর মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মীর জাফরের বংশধররা বাস করেন ভারতের মুর্শিদাবাদের লালবাগে। তারা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের পূর্বপুরুষের করা বিশ্বাসঘাতকতার কলঙ্ক। বাঙালির রাজনৈতিক এবং সামাজিক আলোচনায় আজও মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা উঠে আসে উদাহরণ হিসেবে।
মীর জাফর ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি, যিনি ক্ষমতার লোভে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে গোপনে হাত মেলান। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে তার অধীনে থাকা নবাবের বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তিনি যুদ্ধের ময়দানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে ব্রিটিশদের পরোক্ষ সহায়তা করেন।
ফলে নবাবের অনুগত সেনাপতি মীর মদন নিহত হন এবং পরাজিত হন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। যুদ্ধের পর মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই নবাবকে বন্দি ও হত্যা করা হয় এবং বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে সুগম হয় ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পথ। এই চরম বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আজও বাঙালি সমাজে মীর জাফরের নাম ঘৃণাভরে স্মরণ করা হয়ে থাকে। ঘৃণা পোষণ করা হয় মীর জাফরের অনেক বংশধরের প্রতিও।
সম্প্রতি মীর জাফরের বংশধর রেজা আলী মির্জা জানিয়েছেন, তিনি মারা যাওয়ার পর জাফরগঞ্জ কবরস্থানে (মীর জাফরের পারিবারিক কবরস্থান) সমাহিত হতে চান না। তিনি জানান, মানুষ ওই কবরস্থানে গিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করে এবং মীর জাফরের কবরের ওপর দেয় থুতু। আমি চাই না আমার কবরের সঙ্গেও এমনটা হোক।
রেজা চান এমন কোথাও তাকে কবর দেওয়া হোক যেখানে মানুষ তাকে অন্তত গালি দেবে না।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলায় অমিতাভ ভট্টশালীর এক প্রতিবেদনে মীর জাফরের বংশধর বর্তমানের ‘ছোটে নবাব’ রেজার বাড়ির একটি ছবি ব্যবহার করা হয়। ছবিটি তুলেছেন কৌশিক অধিকারী।
ছবিতে দেখা যায়, বাড়ির দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার ছবি। বিষয়টিকে মূলত পরিবারের তরফ থেকে একটি প্রতীকী প্রায়শ্চিত্ত এবং ইতিহাসের দায়মুক্তির চেষ্টা হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।
এই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা মনে করেন যে, তাদের পূর্বপুরুষ যে ভুল বা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, তার মাসুল বংশপরম্পরায় তাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে তারা এখন আর ‘শত্রু’ নয়, বরং ‘বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব’ এবং নিজেদের আত্মীয় অর্থাৎ মীর জাফরের শ্যালক হিসেবেই সম্মান দিতে চান। এই ছবি টাঙানোর মাধ্যমে তারা সমাজকে এই বার্তা দিতে চান যে, তারা সিরাজউদ্দৌলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। অতীতের সেই কলঙ্কিত ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে চান এখন তারা।
এছাড়াও পরিবারটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের পূর্বপুরুষ ওয়াশিফ আলী মির্জা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় মুর্শিদাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। র্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ডে মুর্শিদাবাদ প্রথমে পাকিস্তানের অংশে পড়লেও ওয়াশিফ আলী মির্জার হস্তক্ষেপে এটি পরে ভারতের অংশ হয়। তারা মনে করেন, তাদের এই দেশপ্রেমের ইতিহাসটি মানুষের কাছে উপেক্ষিতই থেকে গেছে।
কয়েকদিন আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা বাংলার নবাব মীর জাফরের বংশধরদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে।
ভোটার তালিকা থেকেও বাদ পড়েছে মীর জাফরের অনেক বংশধরের নাম।
মুর্শিদাবাদের লালবাগের ‘কেল্লা নিজামত’ এবং তার আশপাশের অঞ্চলের বাসিন্দা নবাব বংশের দেড়শরও বেশি সদস্যের নাম ওই তালিকা থেকে কাটা পড়েছে বলে পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হচ্ছে।
বাদ পড়েছে রেজা মির্জা এবং তার পুত্র সৈয়দ মুহাম্মদ ফাহিম আলি মির্জার নামও।
পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন, ১৯৪৭ সালে অনেক প্রলোভন সত্ত্বেও যে পরিবারের বেশিরভাগই পাকিস্তানে না গিয়ে ভারতে থেকে গিয়েছিলেন, এত বছর পরে কেন নতুন করে তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে?
তবে মীরজাফর পরিবারের একজন নামজাদা সদস্য পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। সেই ইস্কান্দার আলি মির্জা পাকিস্তানের চতুর্থ ও শেষ গভর্নর জেনারেল এবং প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার জন্মও লালবাগের কেল্লা নিজামেই, যেখানে এখন থাকেন ছোট নবাব রেজা মির্জা এবং তার রাজনীতিবিদ পুত্র সৈয়দ ফাহিম আলি মির্জারা।
রেজা মির্জা বিবিসি বাংলাকে এর আগে বলেছিলেন, আমাদের ফ্যামিলির তিন হাজারের মতো সদস্য আছেন। বেশিরভাগ এখনও ভারতেই আছেন। কেউ ইংল্যান্ড, আমেরিকা বা বাইরে চলে গেছেন। তবে তাদের সবার বাড়ি এখানে রয়ে গেছে।
মির্জা মীর জাফরের ১৬তম উত্তরপুরুষ রেজা মির্জা। তিনি স্থানীয় পৌরসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের পৌর প্রতিনিধিও।
তিনি বলছিলেন, মুর্শিদাবাদ শহরে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে অন্য নবাবি স্থাপত্য সব আমাদের পূর্বপুরুষের তৈরি। অথচ ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম কেটে নাগরিকত্বই কেড়ে নেওয়া হলো। আমার পূর্বপুরুষ সৈয়দ ওয়াসিফ আলি মির্জাকে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের পরিবার চিরকাল ভারতে থেকেছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের পরে নবাব বংশের সদস্যদের এ শুনানিতে ডাকা হয়েছিল।
তিনি বলছিলেন, যদি ভোট দিতে না পারি, তাহলে এখানে থাকতে পারব না, আমাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু আমি তো এই মাটিতে জন্ম নিয়েছি।
মীর জাফর কোথা থেকে এসেছিলেন?
মীর জাফরের পূর্বপুরুষরা আরব থেকে এসেছিলেন বলে জানা যায়। মীর জাফরের বংশধররা দাবি করেন যে, তারা ইমাম হাসান ও হোসাইনের উত্তরপুরুষ।
বেশ কয়েকটি প্রামাণ্য ইতিহাস গ্রন্থেও মীর জাফরের বংশ পরিচয়ের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে যেমন আছে ১৯০৫ সালে প্রকাশিত পূর্ণচন্দ্র মজুমদারের লেখা ‘মসনদ অফ মুর্শিদাবাদ’, তেমনই আছে বাংলায় সমকালীন মুসলমানদের নিয়ে লেখা খন্দকার ফজলে রাব্বির আকর গ্রন্থ ‘হাকিকত মুসলমান-ই-বেঙ্গালাহ’-ও। পূর্ণচন্দ্র মজুমদারের বইটিতে তাদের বংশতালিকাও পাওয়া যায়।
প্রয়াত ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায়ের মতে, মীর জাফর বাংলার মুঘল অশ্বারোহী বাহিনীর বকশি ছিলেন, অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে পে-মাস্টার জেনারেল বা প্রধান সেনাপতি। তিনি ছিলেন বিদেশি, আরব বিদেশি। নাজাফ থেকে এসেছিলেন তিনি।
তিনি যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, তখন সাধারণ অশ্বারোহী ছিলেন। তারপরে ধীরে ধীরে তার পদোন্নতি হয় বিশেষ করে আলিবর্দি খাঁয়ের সময়ে। রায় দুর্লভ ছিলেন নিজামত দেওয়ান আর মীর জাফর ছিলেন বকশি। আলিবর্দি খাঁ এদের দিয়ে শপথ করিয়ে নিয়েছিলেন যে তারা সিরাজের পক্ষে থাকবে যে কোনও যুদ্ধে।
তবে শুধু যে মীর জাফরের বংশধরদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তা নয়।
গবেষকরা বলছেন, রাজ্যের মুসলমান অধ্যুষিত দুটি জেলা – মালদা আর মুর্শিদাবাদ, দুই জেলাতেই বহু মুসলমান ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।




