পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল
নতুন মুখ্যমন্ত্রী বাছাইয়ে কোন পথে এগোবে গেরুয়া শিবির?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জোড়াফুলের সাম্রাজ্য ঝরে গিয়ে চারিদিকে গেরুয়া ঝড়ের দাপট। ৪ মের ভোটের ফলাফল ক্রমশ স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একথা পরিষ্কার; অবসান ঘটতে চলেছে দীর্ঘদিনের এক অধ্যায়ের। শুরু হচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক পর্ব। তবে এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে এখন একটাই প্রশ্ন— কে হবেন বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী? একই সঙ্গে জোর জল্পনা, কখন বিদায় হবেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? কবে শপথ নেবে নতুন সরকার?
মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ হতে পারে বৈশাখ মাসের মধ্যেই - সম্ভবত ২৫ বৈশাখের আশেপাশে। যেহেতু ২৫ শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন তাই সেই দিনটিতে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান করে বাঙালির আবেগকে উসকে দিতে পারে বিজেপি।
ভোটের ফল ঘোষণার পর সাংবিধানিক প্রথা অনুযায়ী বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা দেন রাজ্যপালের কাছে। সেই হিসেবে ৪ মে যেহেতু নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে, ফলত ৬ তারিখের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগের সম্ভাবনা প্রবল। আর এরপরই শুরু হবে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, পরিষদীয় দলের বৈঠকের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ হতে পারে বৈশাখ মাসের মধ্যেই- সম্ভবত ২৫ বৈশাখের আশেপাশে। যেহেতু ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন, তাই সেই দিনটিতে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান করে বাঙালির আবেগকে উসকে দিতে পারে বিজেপি। এই পরিস্থিতিতে আগামী মুখ্যমন্ত্রী পদকে ঘিরে একাধিক নাম সামনে উঠে আসছে, যাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা।
শুভেন্দু অধিকারী
শুভেন্দু অধিকারী এই মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নাম। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা এই নেতা পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের সংগঠনের ভিত থেকে উঠে এসেছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর। শুভেন্দু একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ মুখ থাকলেও পরবর্তীতে দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে রাজনৈতিক মানচিত্রে বড়সড় পরিবর্তন আনেন। এবারের নির্বাচনেও নন্দীগ্রামের পাশাপাশি জয়ী হয়েছেন ভবানীপুরেও। সংগঠন, জনসংযোগ এবং দলের কর্মীদের উপর সুকৌশলী নিয়ন্ত্রণক্ষমতার কারণে তিনিই সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার।
নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অগ্নিমিত্রা পাল ও রূপা গঙ্গোপাধ্যায় দুজনেই শিক্ষিত ও পরিচিত মুখ। নারী নিরাপত্তা এবং প্রতীকী বার্তা দিতে দল যদি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায়, তবে কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেওয়াও হতে পারে।
শমীক ভট্টাচার্য
দলের রাজ্য সভাপতি হিসেবে সংগঠন তৈরিতে বড় ভূমিকা রয়েছে শমীক ভট্টাচার্যের। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এই নেতা আদর্শভিত্তিক রাজনীতির জন্য পরিচিত। দলের নেপথ্যে থেকে নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে তিনিও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
দিলীপ ঘোষ
দীর্ঘদিনের সংগঠক এবং প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি হিসেবে জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। টেকনিক্যাল ট্রেডে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর পড়াশোনা। এছাড়াও আরএসএস-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা এই নেতা প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত। রাজ্য সভাপতি থাকাকালীন দলকে শক্ত ভিত গড়ে দেন। গ্রামীণ এবং শহুরে— দুই ক্ষেত্রেই তাঁর প্রভাব রয়েছে, তাই মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে এই নামও গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্বপন দাশগুপ্ত
এই নামটি অনেক সময় আলোচনার আড়ালে থাকলেও রাজনৈতিক মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় স্তরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত স্বপন দাশগুপ্ত বুদ্ধিজীবী রাজনীতির এক পরিচিত মুখ। তিনি বহুদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেও গ্রহণযোগ্য। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সময় থেকেই রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয়। যদিও জনমানসে জনপ্রিয়তা তুলনামূলক কম, তবুও ‘চমক’ প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজে পড়াশোনা, পরে বিদেশে উচ্চশিক্ষা (ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন) গ্রহণ করেন।
নারী মুখের সম্ভাবনা
বঙ্গের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে এবার নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অগ্নিমিত্রা পাল ও রূপা গঙ্গোপাধ্যায় দুজনেই শিক্ষিত ও পরিচিত মুখ। নারী নিরাপত্তা এবং প্রতীকী বার্তা দিতে দল যদি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায়, তবে কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেওয়াও হতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যে অপ্রত্যাশিত মুখকে মুখ্যমন্ত্রী করেছে গেরুয়া শিবির। ফলে সেই প্রবণতা বজায় রেখে বাংলাতেও ‘চমক’ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারীই এগিয়ে। তবুও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপর। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে আবারও এক নতুন অধ্যায় রচিত হতে চলেছে। এক দীর্ঘ শাসনকালের অবসান, তার জায়গায় উঠে আসবে নতুন নেতৃত্ব, নতুন মন্ত্রীসভা, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী তা চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত জল্পনা চলবেই। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, এই পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার নয়, বাংলার রাজনৈতিক চেতনারও এক বড় রূপান্তরের সূচনা। তবে এই পরিবর্তন কতটা ফলপ্রসূ হয় বাংলায় তা সময়ই বলবে!



