মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের সামনে বন্ধুর পথ

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়।
রুপালি পর্দার জনপ্রিয় নায়ক বিজয় এখন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তার এই রাজনৈতিক যাত্রা রাজ্যের ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তার সামনের পথটি মোটেও মসৃণ নয়। তার দল টিভিকে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার টিকিয়ে রাখতে তাকে এখন কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে পুরোপুরি।
জোটসঙ্গীদের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি আর রাজ্যপালের কড়া নজরদারি সামলে প্রথম এক বছর টিকে থাকাই হবে বিজয়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যেসব চ্যালেঞ্জ এ সময় বিজয়কে বেকায়দায় ফেলতে পারে-
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা
টিভিকে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে তাদের কংগ্রেস, বাম দল এবং ভিসিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই জোটের রাজনীতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এবং নীতি নির্ধারণে মিত্রদের সঙ্গে দরকষাকষির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজ্যপালের কড়া নজরদারির মধ্যে প্রথম ৬ থেকে ১২ মাস বিজয়ের টিকে থাকার জন্য বড় পরীক্ষায় পড়তে হবে।
সিনেমা থেকে প্রশাসনে
এমজিআর বা জয়ললিতার মতো কিংবদন্তিরা সিনেমা থেকে রাজনীতিতে এসে সফল হলেও বিজয়ের জন্য সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এখন হবে এক কঠিন পরীক্ষা। কারণ ভোটের প্রচার আর সচিবালয় চালানো এক কথা নয়। আমলাতন্ত্র সামলানো এবং রাজ্যের বাজেট ঠিক রাখা তার জন্য একদমই নতুন অভিজ্ঞতা। ভোটাররা শুধু তার তারকাখ্যাতি দেখে ভোট দিলেও বাস্তবে প্রশাসনিক দক্ষতা না দেখালে মানুষের ভালোবাসা হতাশায় রূপ নিতে পারে খুব দ্রুতই।
শক্তিশালী প্রশাসনিক দল গঠন
বিজয়ের দল যেহেতু একদমই নতুন, তাই তার বেশিরভাগ বিধায়কই এখন পর্যন্ত প্রশাসনিক কাজের কোনো অভিজ্ঞতাই রাখেন না। ডিএমকে বা এআইডিএমকের মতো পুরনো ও শক্তিশালী কোনো সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায় দক্ষ মন্ত্রী খুঁজে বের করা আর দলের ভেতরের কোন্দল থামানো তার জন্য পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
ডিএমকে চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনে ধাক্কা খেলেও এম কে স্ট্যালিন এবং ডিএমকে রাজ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁথে আছে। বিশাল কর্মী বাহিনী এবং শক্তিশালী মিডিয়া নেটওয়ার্ক নিয়ে ডিএমকে একটি আক্রমণাত্মক বিরোধী দল হিসেবে মাঠে থাকবে। এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে এখন ওত পেতে থাকবে বিজয়ের সরকারের সামান্য ভুল ধরিয়ে দিয়ে মাঠ গরম করার জন্য।
এআইডিএমকের সমীকরণ বজায় রাখা
এআইডিএমকের প্রভাব আগের চেয়ে কমলেও গ্রামীণ এলাকায় এবং বিশেষ করে থেভার বেল্টে তাদের বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে। পর্দার পেছনের নানা আলোচনা এবং দলবদল তামিলনাড়ুর রাজনীতিকে যেকোনো সময় অস্থির করে তুলতে পারে।
অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের চাপ
রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন বেশ নাজুক বলে তরুণদের কর্মসংস্থান এবং শিল্পোন্নয়ন নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তবে বিজয় এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন যখন রাজ্য বড় ধরনের রাজস্ব চাপ এবং জনকল্যাণমূলক ভর্তুকির বোঝার মুখে। প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করা তার জন্য বেশ কঠিন হবে।
ভক্তদের প্রত্যাশা পূরণ
এটি বিজয়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভক্তরা সিনেমার পর্দার মতো জাদুর গতিতে সব সমস্যার সমাধান চাইলেও বাস্তবে প্রশাসনের চাকা ঘোরে ধীরগতিতে, আর সিনেমার প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবের অমিল ঘটলে জনগণ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়তে পারে।
কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক
বিজেপির বিপক্ষে বিজয়ের প্রচারের কারণে সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হয়, সেদিকে সবার নজর থাকবে। নিট, জিএসটি বকেয়া এবং ভাষা নীতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাত সামলানো আর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে বিজয়ের রাজনীতির প্রথম ‘অগ্নিপরীক্ষা’।
আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সহিংসতা
ক্ষমতা পরিবর্তন হলে অনেক সময় দলীয় কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যবস্থাপকদের জন্য প্রথম কয়েক মাস আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাটা বেশ কঠিন হবে। প্রতিপক্ষ দলগুলোর চাপ সামলে শান্তি বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বতন্ত্র আদর্শ দাঁড় করানো
কেবল ডিএমকের বিরোধিতা করে রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয় বলে বিজয়কে এখন নিজস্ব এক শক্তিশালী রাজনৈতিক আদর্শ বেছে নিতে হবে। তার দলের অর্থনৈতিক নীতি কী হবে কিংবা সামাজিক বিচারে তিনি কেমন ভূমিকা রাখবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে তামিলনাড়ুর মসনদে তার স্থায়িত্ব।
সিনেমার হিরো হিসেবে বিজয় শত বাধা পার করলেও রাজনীতির এই কণ্টকাকীর্ণ পথে তিনি শেষ হাসি হাসতে পারেন কি না, তা দেখার জন্য পুরো ভারত অপেক্ষা করছে আগ্রহ ভরে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ-১৮ অবলম্বনে






