চাপা দেওয়া ইতিহাসের খোঁজে পাঞ্জাবের হাজারো মানুষ

পাঞ্জাবে হাজারো গুমের তদন্ত করা সমাজকর্মী যশবন্ত সিং খালরাওকে ১৯৯৫ সালে হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে
তিন দশক আগে ভারতের পাঞ্জাবের নিখোঁজ, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও সহিংসতার ইতিহাস আবারও আলোচনায়। সেই ইতিহাসের বয়ান ঘিরেই বিতর্কের কেন্দ্রে ‘সতলুজ’ সিনেমা। সরকার ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুললেও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া এই চলচ্চিত্র দেখতে শিখ মন্দির, কমিউনিটি হল ও খোলা মাঠে ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। অনেকের কাছে এটি অতীতকে স্মরণে রাখার এক প্রতীকী প্রতিরোধ।
‘সতলুজ’ চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে মানবাধিকারকর্মী জস্বন্ত সিং খালরার গল্প। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৫ সালে পাঞ্জাবে হাজারো নিখোঁজ ও কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার পর পুলিশ তাকে নির্যাতন করে হত্যা করে।
সরকারের পক্ষ থেকে চলচ্চিত্রটির পরিচালক হানি ত্রেহানের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। মুক্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সিনেমাটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও গুরদাসপুর জেলার একটি শিখ মন্দিরের প্রাঙ্গণে আয়োজিত প্রদর্শনীতে বিপুলসংখ্যক দর্শক উপস্থিত হন।
অনেকের কাছে এই প্রদর্শনী ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ। তাদের বিশ্বাস, পাঞ্জাবের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি স্মরণে রাখার এটি একটি প্রচেষ্টা।
৩২ বছর বয়সী শামশের সিং দ্বিতীয়বারের মতো সিনেমাটি দেখার পর এএফপিকে বললেন, ‘এই সিনেমা আমাদের এমন অনেক কিছু দেখিয়েছে, যা আমরা জানতাম না এবং সরকার যা আড়াল করে রাখতে চায়।’
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শন বা বিতরণে কোনো নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা না দিলেও নিষিদ্ধ হওয়ার গুঞ্জন জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। অনেকে বলছেন, এই বিতর্কই বরং সিনেমাটি দেখার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাঞ্জাবজুড়ে বিভিন্ন শিখ সংগঠন মন্দিরের প্রাঙ্গণ, কমিউনিটি হল এবং গ্রামের খোলা মাঠে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর আয়োজন করছে।
গুরদাসপুরের প্রদর্শনীর অন্যতম আয়োজক এবং কৃষকনেতা ইন্দরপাল সিং বেইনস বললেন, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমরা অন্তত পাঁচটি প্রদর্শনীর আয়োজন করছি।’
তিনি বললেন, ‘এত বেশি আগ্রহ যে দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি হয়েছে। এখনও প্রদর্শনীর অপেক্ষায় রয়েছে অনেক গ্রাম।’
নিখোঁজের সেই অন্ধকার অধ্যায়
১৯৮০-এর দশক ও ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে পাঞ্জাব ছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এবং স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’-এর দাবিতে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতের কেন্দ্র।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ সংঘাতে হাজারো বেসামরিক মানুষ, পুলিশ সদস্য এবং সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হন। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কঠোর ধর্মীয় বিধান চাপিয়ে দেয় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করে। অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীও কঠোর দমন অভিযান চালায়।
১৯৮৪ সালে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে অবস্থান নেওয়া বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী অভিযান চালায়। শিখ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে পবিত্র এই উপাসনালয়ে সামরিক অভিযান ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এর কিছুদিন পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার দুই শিখ দেহরক্ষীর হাতে নিহত হন। এরপর দেশজুড়ে দাঙ্গায় প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারান।
১৯৯১ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সময় নিহত হন হারজিন্দর কৌরের বাবা। তার কাছে ‘সতলুজ’ সিনেমাটি পারিবারিক ক্ষতের স্মৃতি আবারও জাগিয়ে তোলে।
কৌর জানান, বাবার মৃত্যুর দুই বছর পর তার মা ও দুই মামাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ তাদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেও এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
তিনি বললেন, ‘আমার বাবা তার কাজের পরিণতি ভোগ করেছেন। কিন্তু আমার মা ও মামাদের কোনো দোষ ছিল না। তাদের জন্যই আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়।’
‘বিতর্কিত দাবি’ নাকি ইতিহাসের সত্য?
‘সতলুজ’ চলচ্চিত্রে দাবি করা হয়েছে, ওই সময়ের অস্থিরতায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছিল। সিনেমাটিতে জস্বন্ত সিং খালরার সেই তদন্ত এবং পরবর্তীতে তার নিজের অপহরণের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, ইতিহাসের একপাক্ষিক ব্যাখ্যা দিয়েছে চলচ্চিত্রটি।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা রবনীত সিং বিট্টু বললেন, ‘বিতর্কিত দাবিকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করে “সতলুজ” সৃজনশীল স্বাধীনতার আড়ালে লুকাতে পারে না।’
তিনি আরও বললেন, ‘পাঞ্জাবের বেদনাদায়ক অতীত কোনো নির্দিষ্ট বয়ান প্রতিষ্ঠার জন্য ইচ্ছেমতো সম্পাদনা করার বিষয় নয়।’ বিট্টুর দাদা বিয়ান্ত সিং ১৯৯৫ সালে নিহত হওয়ার আগে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।
অন্যদিকে পরিচালক হানি ত্রেহান এএফপিকে বলেছেন, তার চলচ্চিত্রে ‘সত্যই তুলে ধরা হয়েছে’। দর্শকদের কাছ থেকে তিনি ব্যাপক ভালোবাসা ও প্রশংসা পেয়েছেন বলেও দাবি করেন।
তিনি বললেন, জস্বন্ত সিং খালরা নিজেও বিভিন্ন বক্তব্যে ২৫ হাজার মানুষ অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ তুলেছিলেন।
খালরা অপহরণ মামলার অন্যতম সাক্ষী রাজীব সিং রন্ধাওয়া মনে করেন, চলচ্চিত্রটি নিয়ে সমালোচনা অতিরঞ্জিত। অমৃতসরে নিজের বাড়িতে এএফপিকে তিনি বলেছেন, ‘একটি সিনেমা কোনো রাষ্ট্র বা ব্যক্তির জন্য হুমকি হতে পারে না।’ তার মতে, ‘নিষেধাজ্ঞার গুঞ্জনই বরং খালরার গল্প লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।’




