পরাজয় মমতার জন্য হতে পারে আশীর্বাদ!

মমতার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ছবি: দ্যা হিন্দু
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সবশেষ ফল দেখে তৃণমূলের পরাজয় নিশ্চিত ধরে নিয়েছেন অনেকে। যদিও এখনো আসেনি চূড়ান্ত ফল। তবে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফল দেখে অনেকটাই স্পষ্ট ‘বাংলা জয়ের’ পথে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ভোটের ফল নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। নির্বাচনের আগেই ভোটাধিকার হারিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লাখ ১৬ হাজার বাসিন্দা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি দলের ভোটার সংখ্যা কমাতে এই চাল দিয়েছে অপর একটি দল। ক্ষমতার লড়াইয়ে এবার ভিন্ন চিত্রই দেখেছে পশ্চিমবঙ্গবাসী। একদিকে যেমন রাজ্যের ইতিহাসে শান্তিপূর্ণ, সহিংসতা ছাড়া ভোট হয়েছে অন্যদিকে ছিল সর্বোচ্চ ভোট পড়ার রেকর্ড। আলোচনায় এখন তৃণমূলের পরাজয় ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যত। দলের এই ‘সম্ভাব্য পরাজয়’ কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মমতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দীর্ঘমেয়াদী আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন। যদিও এতে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমতার লোকসান হবে।
পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ। স্বাধীন ভারতের রাজ্যে এটিই সর্বোচ্চ ভোটহার
পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ। স্বাধীন ভারতের রাজ্যে এটিই সর্বোচ্চ ভোটহার। যদিও রাজ্যটিতে বরাবরই অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বেশি ভোট পড়ে। কিন্তু শহর-গ্রামাঞ্চল নির্বিশেষে ৯০ শতাংশর কাছাকাছি বা তার বেশি ভোট পড়া নজিরবিহীন ঘটনা।
ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গে এর আগে (শতাংশের হিসাবে) সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০১১ সালের বিধানসভায়। ৮৪.৭২ শতাংশ। এত বেশি ভোট পড়ার সঙ্গে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের সম্পর্ক টানছেন অনেকেই। এই যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৯০ লাখের বেশি নাম। তাতে ছোট হয়ে গেছে ভোটার তালিকা। সেই হিসাবে ভোটদানের শতকরা হার বাড়ানোর পাটিগণিত মেনে নেওয়াই যায়।
বিরোধীরা রসিকতা করে বলে থাকেন, তৃণমূল কংগ্রেসে আসলে একটাই পদ বা ‘পোস্ট’, আর সেটা শুধু মমতার— বাকি সব ‘ল্যাম্পপোস্ট’
এসআইআরে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কারণে লাখ লাখ বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ায় ভয় ঢুকে গেছে অনেকের মনে। এবার ভোট না দিলে আগামীতে তালিকা থেকে নাম বাদ পড়তে পারে— নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার এমন শঙ্কাও ছিল ভোটারদের।
সার্বিক পরিস্থিতি সামলে তৃণমূলের জয়ে ফেরাটা শুরু থেকেই ছিল চ্যালেঞ্জিং। গেরুয়া শিবিরে যে উৎসবের হাওয়া বইতে শুরু করেছিল ভোটের আগেই। তবে মমতা ও তৃণমূল একই সত্ত্বা। বিরোধীরা যাকে রসিকতা করে বলে থাকেন, তৃণমূল কংগ্রেসে আসলে একটাই পদ বা ‘পোস্ট’, আর সেটা শুধু মমতার— বাকি সব ‘ল্যাম্পপোস্ট’!
২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস গোটা রাজ্যে মাত্র একটি আসনে জিতেছিল, তখনও ভবানীপুরসহ দক্ষিণ কলকাতার এমপি ছিলেন মমতা
তবে মমতা নিজের রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় অতীত ইতিহাসেই মিলবে। কলকাতার দক্ষিণে যাদবপুর বা দক্ষিণ কলকাতার মতো আসনে তিনি গত ৪২ বছর ধরে একটানা জিতে আসছেন। এখন তিনি যে ভবানীপুর আসনের প্রার্থী সেটাও এই এলাকার ভেতরেই। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যখন গোটা রাজ্যে মাত্র একটি আসনে জিতেছিল, তখনও এই ভবানীপুরসহ দক্ষিণ কলকাতার এমপি ছিলেন তিনি।দীর্ঘদিন টানা ক্ষমতায় থাকার ফলে মমতা ও তার দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল আকাশচুম্বি। রাজ্যবাসী এক প্রকার অতিষ্ঠ হয়েই ছিল। এবার পরাজিত হলে ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী বিরোধী জনমত এবং দলীয় সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির অভিযোগের বোঝা থেকে দূরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন মমতা। ভবিষ্যতে আবারও আদি ‘তৃণমূল স্তরের বিরোধী নেত্রীর’ ভূমিকায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকছে তার। আর বিধানসভায় শক্ত বিরোধী দল হিসেবে নতুন সরকারকে আরও আগ্রাসীভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারবেন।পশ্চিমবঙ্গের দৈনন্দিন শাসনকাজের চ্যালেঞ্জ না থাকলে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আরও বেশি সময় দিতে পারবেন। এতে ‘ইন্ডিয়া জোটে’ আরও শক্তিশালী করবে তার অবস্থান। কেন্দ্রে বিজেপির বিরোধিতায় একটি বড় ভূমিকা পালনের সুযোগ থাকবে মমতার জন্য। পরাজয় ঘোষণার পর সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারলে জাতীয় রাজনীতিতে মমতার সক্ষমতা হয়ত দেখতে পাবে ভারতীয়রা। এই পরাজয় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে। এটি তাকে দলের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি মোকাবিলা ও বিতর্কিত স্থানীয় নেতাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে দলের কাঠামো নতুন করে সাজানোর সুযোগ দেবে।সেইসঙ্গে বিরোধী দলে থেকে নিজেকে জাতীয় স্তরের একজন প্রধান বিরোধী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আরও ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনা থাকছে। বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকাও নিতে পারবেন মমতা।




