মমতাকে ডোবাচ্ছেন ভাতিজা!

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামে ২০০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা কেমিক্যাল হাব গড়ার লক্ষ্যে জোরপূর্বক কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে তীব্র কৃষক আন্দোলন। সে সময় পুলিশ ও গ্রামবাসীর সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং আহত হন অনেকেই।
নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আস্থাভাজন’। ধারাবাহিকভাবে কৃষিজমি অধিকার রক্ষা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় রাখা থেকে শুরু করে অন্য পরিকল্পনা— সবই ছিল শুভেন্দুর ওপর।
কারণ, নন্দীগ্রাম শুভেন্দুর ‘চেনা মাঠ’। তিনি কাঁথির ভূমিপুত্র। নন্দীগ্রামে ‘পরীক্ষিত’ শুভেন্দুকে লালগড় ও নেতাইতেও ব্যবহার করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী। এমপি শুভেন্দুকে তুলে এনে বিধানসভায় লড়িয়ে ২০১৬ সালে রাজ্য মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসেন মমতা। সেই পর্ব থেকেই বৈপরীত্য শুরু হয় দুজনের। ক্রমেই আলাদা হতে থাকে তাদের পথ।
২০২০ সালে শুভেন্দু তৃণমূল ছাড়েন। মূলত তৃণমূলে থাকা অবস্থায় মমতা তার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আস্থাভাজন করে তোলার চেষ্টা চালান। বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি শুভেন্দু। এ কথা নানা সময়েই তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর তৃণমূল ছাড়ার পর একই বছরের ২৫ ডিসেম্বর এক খোলা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘তৃণমূলে পচন ধরেছে। গত ১০ বছরে দলে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্যক্তিস্বার্থেই এখন তৃণমূল চলছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাই এখন তৃণমূলে কোণঠাসা।’
এরপর বিভিন্ন সময় শুভেন্দুর বক্তব্যে উঠে এসেছে মমতার স্বজনপ্রীতির প্রসঙ্গ। ২০২৩ সালে নন্দীগ্রামের এক জনসভায় তিনি মন্তব্য করেন, ‘সিপিএমকে সাফ করেছি, এবার পিসি-ভাইপোকেও গ্যারাজ করব। আগামী বছর ভাইপো ভেতরে থাকবে।’
শুভেন্দুর কথায় স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি মমতা ও তার ভাতিজা অভিষেকের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বারবার উঠে এসেছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম, যিনি মমতার ভাতিজা হওয়ার কারণে দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। বিরোধীদের দাবি, দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও সিদ্ধান্তে তার প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করা হয়েছে।
মমতা নিজেও কয়েকবার দিয়েছেন এই সমালোচনার জবাব। ২০২২ সালের ২৮ জুলাই এক জনসভায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমার পরিবার বলতে বাংলার মানুষ। ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে রাজনীতি করি না।’ তার মতে, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে বাস্তবতা হলো, তৃণমূলের ভেতরে নেতৃত্বের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ধীরে ধীরে হয়েছে জোরালো। অনেক পুরনো নেতা নীরবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, যদিও প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন খুব কমই।
সর্বশেষ চলতি বছরেই শুভেন্দু আরেকটি মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘তৃণমূল পারিবারিক পার্টি হয়ে গেছে, যারা আছে দাসত্ব করছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতার স্বামী বা সন্তান নেই, সংসারও নেই। যিনি স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেই মমতাও স্বজনপ্রীতির বলয় থেকে পারেননি বেরোতে। অভিষেককে কার্যত নিজের উত্তরাধিকারী করে তোলার চেষ্টা করেছেন। অনেকের মতে, এ পথেই মমতার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে।
পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই মনে করছেন, মমতাকে ডোবাচ্ছেন ভাতিজা অভিষেক।





