পর্দার ‘বিগিল’ কি বাস্তবের রাজনীতিতে ‘বিজয়’ এনে দেবে?

থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত
একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী শুধু নিজের ভোট দিতে দেশে আসেন। নিজের বিমান থেকে নেমে তিনি সোজা ভোটকেন্দ্রে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, তার ভোট আগেই কেউ দিয়ে দিয়েছে। ভোট না দিতে পারার কারণে তিনি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে বিদেশযাত্রা বাতিল করে তিনি নির্বাচন কমিশনে যান এবং পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিতে অবস্থান নেন।
গল্পটি ‘সরকার’ সিনেমার। এই সিনেমাটিতে ভোটাধিকার, নির্বাচনী দুর্নীতি এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিজয়। থালাপতি বিজয়। দক্ষিণ ভারতের এই জনপ্রিয় তারকা দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতিসংক্রান্ত বিষয়ভিত্তিক গল্পে কাজ করে আসছেন। দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষকের সংকট, নারীর অধিকার ও তরুণদের ভবিষ্যৎসহ নানা সামাজিক ইস্যু তার অনেক সিনেমাতে গুরুত্ব পেয়েছে।
বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনায় রয়েছেন তিনি। তার নেতৃত্বাধীন দল তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম (টিভিকে) বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনায় এগিয়ে আছে বলে খবর মিলছে। তিনি পেরাম্বুর ও তিরুচিরাপল্লি ইস্ট-এই দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং দুই আসনেই এগিয়ে থাকার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে তার পুরোনো সিনেমাগুলোও নতুন করে আলোচনায় ফিরে এসেছে।
নারীর ক্ষমতায়নের বার্তা নিয়ে নির্মিত ‘বিগিল’ সিনেমায় নারী ফুটবলারদের সংগ্রাম, সামাজিক বাধা এবং সুযোগের অভাবকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়েছে। খেলাধুলার মাধ্যমে লিঙ্গসমতার প্রয়োজনীয়তা এখানে শক্তভাবে তুলে ধরা হয়।
‘মার্শাল’ সিনেমায় স্বাস্থ্যখাতের নানা অসংগতি, চিকিৎসা ব্যবস্থার বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে কেন্দ্র করে কাহিনি গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে চিকিৎসা সেবায় করপোরেট প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, লুঙ্গি পরে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় তাকে হেনস্তার মুখে পড়তে হয়। ঠিক সেই সময় লবিতে একজন অসুস্থ মানুষকে দেখে তিনি দ্রুত সাহায্যে এগিয়ে যান। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে বিমানবন্দরের ডাক্তার জানান, তিনি একজন বিখ্যাত চিকিৎসক। দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করা বিজয় এখানে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
কৃষক সংকট, করপোরেট শোষণ ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরাসরি অবস্থান দেখা যায় ‘কাথ্থি' সিনেমায়। গ্রামীণ মানুষের দুর্দশা ও ভূমি দখলের মতো বিষয়গুলো এখানে জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘থুপ্পাক্কি’ অ্যাকশন থ্রিলার হলেও জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে বিজয় দায়িত্বশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
‘মাস্টার’ সিনেমায় কিশোর সংশোধনাগার, অপরাধচক্র এবং তরুণদের বিপথগামিতা নিয়ে গল্প এগিয়েছে। সেখানে নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের বিষয়গুলোও উঠে আসে। আর ‘থেরি’ সিনেমায় একদিকে একজন কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, অন্যদিকে স্নেহশীল বাবার চরিত্রে বিজয়ের অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এই সিনেমাগুলো বিনোদনের পাশাপাশি সমাজের গভীর বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। তাই অনেকের মতে, বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা হঠাৎ নয়, বরং তার সিনেমার ভাষারই একটি স্বাভাবিক সম্প্রসারণ।
ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বিজয়। তিনি তার ৬৯তম সিনেমা ‘জন নায়ক’কে শেষ সিনেমা হিসেবে ঘোষণা দেন। চেন্নাইয়ে এক সমাবেশে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি অভিনেতা হয়েই রাজনীতিতে এসেছেন, কিন্তু রাজনীতিতে অভিনয় করছেন না।
চেন্নাইতে জন্ম নেওয়া বিজয়ের আসল নাম যোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। ভক্তদের কাছে তিনি ‘থালাপতি’ নামেই বেশি পরিচিত। তার বাবা এস এ চন্দ্রশেখর ছিলেন কলিউডের একজন প্রখ্যাত পরিচালক। বাবার পরিচালনায় তিনি প্রায় ১৫টি সিনেমায় কাজ করেছেন।
১৯৮৫ সালে রজনীকান্তের সঙ্গে ‘নান সিবাপু মনিথন’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করেন তিনি। পরবর্তীতে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা তাঁকে তামিল সিনেমার শীর্ষ তারকাদের কাতারে নিয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন একটাই, পর্দার সেই প্রভাব বাস্তব রাজনীতিতে কতটা স্থায়ী হয়। ভোটাররা তার প্রতি আস্থা রাখেন কি না, সেটাই আগামী সময়ের বড় পরীক্ষার বিষয়।



