ধর্মেন্দ্র প্রধান থেকে বিশ্ব রাজনীতির শিক্ষা
ইতিহাসের আদালতে ক্ষমতার বিচার

ছবি: রয়টার্স
রাজনীতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর আয়না হল 'ইতিহাস'। সে কখনও কাউকে ক্ষমা করে না। ১৯৯৭ সালে যে তরুণ প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে লাঠি খেয়েছিলেন, ২০২৬ সালে তিনিই প্রশ্নফাঁসের জবাব দিতে না পেরে মন্ত্রিসভা ছাড়লেন। এই ছবি শুধু ভারতীয় পদত্যাগ করা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নয়। এটি ক্ষমতার এক চিরন্তন বিদ্রূপ। ইতিহাস মাঝে মাঝে এমনভাবে ফিরে আসে যেন মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি স্লোগানের হিসাব সে একদিন সুদেআসলে মিটিয়ে নেয়। রাজনীতিতে ক্ষমতা আসলে কখনও শুধুমাত্র একটি চেয়ার নয়। ক্ষমতা একটি আয়না। বিরোধী দলে থাকাকালীন মানুষ যে কথাগুলো বলে, ক্ষমতায় বসে সেই কথাগুলো বেমালুম ভুলে যায়। প্রতিবাদে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা সহজ। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব কাঁধে এলে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অনেক কঠিন। ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক যাত্রা সেই কঠিন সত্যটিকেই আবার সামনে এনে দিল। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাকটনের একটি বিখ্যাত উক্তি “Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely " অর্থাৎ ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার প্রবণতা রাখে, আর সীমাহীন ক্ষমতা সেই প্রবণতাকে আরও গভীর করে। এই উক্তিকে শুধু আর্থিক দুর্নীতির অর্থে পড়লে ভুল হবে। বস্তুতপক্ষে ক্ষমতা অনেক সময় স্মৃতিকেও বদলে দেয়।
ভারতের সাম্প্রতিকতম ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ছাত্রজীবনে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ধর্মেন্দ্র প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এমন এক সংকটের মুখে পড়লেন যেখানে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর আস্থা ভরসা প্রশ্নের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হল তাঁকে। এই ঘটনাকে শুধুই একজন মন্ত্রীর ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক - যেখানে বিরোধী অবস্থানের ভাষা এবং ক্ষমতার ভাষা এক থাকে না।
ভারতের বাইরেও ইতিহাস একই প্রশ্ন তুলেছে
নেপালের কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন শাহ প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে দেশের তরুণদের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ক্ষমতা পরবর্তী সময়ে তাঁর কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেউ সাহসী সংস্কার বলেছেন, কেউ আবার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বলপ্রয়োগ বলে সমালোচনা করছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা এখন আর আগের মতো নেই। মানুষের ক্ষোভ জমা হচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধেও। এখানে মূল শিক্ষা একটাই - ক্ষমতায় এলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয়। শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন ছিল জনরোষের বিস্ফোরণ। মানুষ ভেবেছিল, শাসক বদলালেই রাষ্ট্র বদলে যাবে,সব বদলে যাবে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক ঋণের শর্ত সহ কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্তের বোঝা থেকেই যায়। আন্দোলনের স্বপ্ন এবং প্রশাসনের বাস্তবতার দূরত্ব তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৪ সালে গ্রিসেও সিরিজা দল কঠোর মিতব্যয়ী অর্থনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে
২০১৫ সালে অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের নেতৃত্বে তারা ক্ষমতায় আসে কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের চাপে ক্ষমতায় এসে তাদেরই বহু কঠিন অর্থনৈতিক শর্ত মেনে নিতে হয়। যারা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তারাই বাস্তবতার কাছে আপস করতে বাধ্য হয়েছিল। ২০০৯ সালে ইতালির ফাইভ স্টার মুভমেন্টও নিজেকে পুরনো রাজনীতির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছিল। ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তারা সবচেয়ে বড় একক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং পরে জোট সরকারে যোগ দেয়। কিন্তু জোট সরকারে অংশ নেওয়ার পর তাদের বহু অবস্থান বদলাতে হয়।
১৯৯৬ সালে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) গঠন করেন ইমরান খান। দীর্ঘদিন তিনি দুর্নীতি ও বংশানুক্রমিক রাজনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর সরকার অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপকভাবে জনরোষের মুখে পড়ে। ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারানোর পর তিনি আবার সেই আন্দোলনের রাজনীতির কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে ওঠেন। ইতিহাস যেন বৃত্তাকারে ঘুরে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যায়।
লাতিন আমেরিকার ইতিহাস আরও কঠিন শিক্ষা দেয়। বহু নেতা সামাজিক ন্যায়বিচার, অন্যায়ের বিরোধিতা, বৈষম্যহীনতা ও দুর্নীতি বিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসামাত্র তাঁদের অনেকের সরকারই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, বিরোধী দমনের অভিযোগ এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার সমালোচনার মুখে পড়ে। আবার ১৯৯৪ সালে বর্ণবিদ্বেষের অবসানের পর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকার শাসকদল হয়। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে যে দল ন্যায়, সমতা ও মুক্তির প্রতীক ছিল। পরবর্তী তিন দশকে সেই দলকেই দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির অব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। এতে বোঝা যায় ক্ষমতায় এসে আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে ধরে রাখা কত কঠিন।
১৯৮০ সালে লেখ ওয়ালেসার নেতৃত্বে ‘সলিডারিটি’ শ্রমিক আন্দোলন পূর্ব ইউরোপের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। পরে ওয়ালেসাই রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু সেই একই পুনরাবৃত্তি, ক্ষমতায় এসে অর্থনৈতিক সংস্কার, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে তাঁকেও তীব্র জনরোষের মুখে পড়তে হয়। আন্দোলনের জনপ্রিয়তা সবসময় সফল শাসনে রূপ নেয় না এবং আন্দোলনকারীও সফল শাসক হয়না এটিও ইতিহাসের একটি শিক্ষা।
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত The History of Sexuality, Volume গ্রন্থে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো লিখেছিলেন, 'ক্ষমতা কেবল শাসকের হাতে থাকে না। ক্ষমতা সমাজের প্রতিটি স্তরে কাজ করে এবং মানুষের আচরণও বদলে দেয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রশ্নটি শুধু ‘ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয় কি না’ নয়, বরং ‘ক্ষমতা মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসরকে কীভাবে বদলে দেয়’ - এই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয়?
ক্ষমতা কি মানুষকে বদলে দেয়, নাকি মানুষের সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করে? বিরোধী রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে হয় আইন, আদালত, অর্থনীতি, আমলাতন্ত্র, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে দাঁড়িয়ে। আর সেখানেই আদর্শের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘর্ষ হয়, চলে দুইয়ের টানাপোড়েন
অন্ধ্র ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক স্টিফেন রাজু আগামীর সময়কে বলেন, 'ক্ষমতা কোনও মানুষকে রাতারাতি বদলে দেয় না। বরং ক্ষমতায় বসার পর তার আদর্শ, সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়। বিরোধী দলে থাকাকালীন নৈতিকতার প্রশ্ন তোলা সহজ কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে একই নীতি ধরে রাখা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। ধর্মেন্দ্র প্রধানের ঘটনাও সেই চিরন্তন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বেরই প্রতীক- যেখানে আন্দোলনের স্লোগান একদিন শাসকের কাছেই জবাব দাবি করে।'
কলকাতার মানবাধিকার কর্মী এবং ভি এস এন কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক মেঘনাদ বিশ্বাস বলেন, 'ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয়- এই কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। ক্ষমতা মানুষের আদর্শ, ধৈর্য এবং নৈতিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা নেয়। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় প্রতিটি সমস্যার সহজ সমাধান দেখা যায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে এলে বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই হয়। ইতিহাস তাই বারবার দেখিয়েছে যে, আন্দোলনের স্লোগান আর শাসনের সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়। যে নেতা একসময় জবাবদিহি দাবি করেছিলেন তিনিই পরে জবাবদিহির মুখোমুখি হন। আর গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই- ক্ষমতা বদলায় কিন্তু ইতিহাস প্রশ্ন করা বন্ধ করে না। অন্যদিকে নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক তথা কলামিস্ট অর্ণব দাস বলেন, 'তবু গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই- মানুষ ভুলে যায় না। পুরনো বক্তৃতা, পুরনো ছবি, পুরনো আন্দোলন একদিন ফিরে আসে। ইতিহাসের আদালতে কোনও ভিডিও ডিলিট হয় না, কোনও পোস্টার পুরনো হয় না।'
ইতিহাস অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, দশক কেটে যায়, সরকার বদলায়, পতাকা বদলায়, স্লোগান বদলায় কিন্তু মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি প্রতিশ্রুতি, প্রতিটি প্রতিবাদ সে নিঃশব্দে সংরক্ষণ করে রাখে। তারপর একদিন, যখন ক্ষমতার করিডরে সেই মানুষটিই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আসনে বসেন, ইতিহাস তার পুরনো ডায়েরির একটি হলুদ হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা ফেরত দেয়। ঠিক যেভাবে সমুদ্র তার ঢেউয়ে ফেরত দেয় সেইসব জিনিস যা সে গিলেছিল। ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক যাত্রা সেই কারণেই কেবল একজন নেতার উত্থান বা পতনের গল্প নয়। এটি আমাদের সময়ের এক গভীর রাজনৈতিক রূপক। যে হাত একদিন শ্রমিকের দাবিতে মুষ্টিবদ্ধ হয়েছিল, যে হাত একদিন ছাত্রদের পক্ষে উঠেছিল। সেই হাতেই প্রশাসনের ভার এসে যখন পড়লো তখন তা আর কারোর জন্যই উঠলো না কেবল নিজেদের স্বার্থ ছাড়া।
ক্ষমতা শুধু অধিকার দেয় না। ক্ষমতা স্মৃতিরও পরীক্ষা নেয়। আর সেই পরীক্ষায় নম্বর দেয় জনগণ, কিন্তু খাতা মূল্যায়ন করে ইতিহাস। সম্ভবত রাজনীতির সবচেয়ে বড় সত্য এটাই- ক্ষমতা কখনও স্থায়ী নয়, বিজয়ও নয়, পরাজয়ও নয়। স্থায়ী থাকে শুধু মানুষের স্মৃতি এবং ইতিহাসের নির্মম নীরবতা। কারণ ইতিহাসের আদালতে কোনও বক্তৃতা হারিয়ে যায় না, কোনও পোস্টার বিবর্ণ হয় না, কোনও লাঠির আঘাত মুছে যায় না। সেখানে একদিন প্রত্যেক শাসককেই নিজের অতীতের সাক্ষীর সামনে দাঁড়াতে হয়। আর সেই বিচারে রায় লেখে না কোনও সরকার, কোনও আদালত বা কোনও দল - রায় লেখে সময়।






