ব্রিটেনে অভিবাসন ঠেকাতে 'ডেলিভারো আইনের প্রস্তাব রিফর্মের
- অবৈধ কর্মী রাখলেই কর্তার জেল, সংস্থার বিশ্বব্যাপী আয়ের ১০ শতাংশ জরিমানার ছক
- কর্মীর আইনি অবস্থান জানা না থাকলেও দায় এড়াতে পারবেন না নিয়োগকর্তা

ব্রিটেনে অভিবাসন কমানোর নতুন পরিকল্পনায় এমনই কঠোর প্রস্তাব সামনে এনেছে নাইজেল ফারাজের দল রিফর্ম ইউকে।
কোনো প্রতিষ্ঠানে অবৈধ অভিবাসী কাজ করছেন এমন প্রমাণ মিললেই সংস্থার বিশ্বব্যাপী আয়ের উপর করা হবে ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা। কারাগারে যেতে পারেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী বা দায়িত্বশীল কর্তাও। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মীর অভিবাসনগত অবস্থান সম্পর্কে তারা জানতেন না–এই যুক্তিতেও মিলবে না রেহাই।
ব্রিটেনে অভিবাসন কমানোর নতুন পরিকল্পনায় এমনই কঠোর প্রস্তাব সামনে এনেছে নাইজেল ফারাজের দল রিফর্ম ইউকে। ডানপন্থী এই দলের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ বৃহস্পতিবার এক বক্তৃতায় পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরবেন। প্রস্তাবটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডেলিভারো আইন’। খাবার সরবরাহসহ অস্থায়ী ও অনলাইনভিত্তিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রকে লক্ষ্য করেই এই নাম।
ইউসুফের দাবি, রিফর্ম ক্ষমতায় এলে অবৈধ অভিবাসীদের কাজে নেওয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করবে। কিছু প্রতিষ্ঠানের পুরো ব্যবসায়িক কাঠামোই অবৈধ শ্রমিক নিয়োগ করে মুনাফা তৈরির উপর দাঁড়িয়ে–এমন অভিযোগও করেন তিনি।
না জানলেও দায়
বর্তমান ব্রিটিশ আইনে কোনো কর্মীর কাজের বৈধ অধিকার ঠিকমতো যাচাই না করে তাকে নিয়োগ দিলে প্রতিজনের জন্য সর্বোচ্চ ৬০ হাজার পাউন্ড জরিমানা হতে পারে। তবে নিয়োগের আগে নির্ধারিত নিয়মে প্রয়োজনীয় যাচাই করা হয়েছিল–এটি প্রমাণ করতে পারলে নিয়োগকর্তা সাধারণত দেওয়ানি জরিমানা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। গুরুতর ঘটনায় পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, সীমাহীন জরিমানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কিংবা পরিচালক হিসেবে অযোগ্য ঘোষণার ব্যবস্থাও রয়েছে।
রিফর্মের প্রস্তাব এই সুরক্ষা আরও সংকুচিত করার ইঙ্গিত দেয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে অবৈধ কর্মী পাওয়া গেলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হবে, তিনি বিষয়টি জানতেন কি না–তা বিবেচ্য হবে না। অর্থাৎ কর্মীর কাগজপত্র যাচাইয়ের দায় পুরোপুরি প্রতিষ্ঠান ও তার শীর্ষ কর্তাদের উপর চাপানোর পরিকল্পনা।
তবে প্রস্তাবটি এখনও কোনো আইন নয়। রিফর্ম ইউকে সরকার গঠন করলে এটি কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আইনটি কীভাবে প্রয়োগ হবে, কোন কর্মকর্তাকে দায়ী করা হবে কিংবা অজান্তে ঘটে যাওয়া ভুলের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকবে কি না–এসব বিষয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করা হয়নি।
জনতার কাছ থেকেও তথ্য চাইবে রিফর্ম
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় সন্দেহভাজন অবৈধ কর্মীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। সংবাদমাধ্যমে এটিকে ‘তুর্কি নাপিতের দোকান তথ্যসেবা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দেওয়া প্রতিটি অভিযোগ পুলিশকে তদন্ত করতে হবে–রিফর্মের পরিকল্পনায় এমন ব্যবস্থার কথাও রয়েছে।
জরিমানার অর্থ অভিবাসী-সংশ্লিষ্ট অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা এবং শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যবহারের প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি। তবে জাতিগত পরিচয় বা ব্যবসার ধরন দেখে সন্দেহ করার প্রবণতা বাড়তে পারে–এমন আশঙ্কা ঘিরে প্রস্তাবটি বিতর্কের মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আগেই অভিযান বাড়িয়েছে সরকার
অবৈধ কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে বর্তমান লেবার পার্টি সরকারও অভিযান জোরদার করেছে। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে ১২ হাজার ৭৯১টি অভিযান চালিয়ে ৮ হাজার ৯৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছর অভিযান ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আগের সমপরিমাণ সময়ের তুলনায় অভিযান বেড়েছে ৭৭ শতাংশ এবং গ্রেপ্তার ৮৩ শতাংশ। অনলাইনভিত্তিক কাজ, খাবার সরবরাহ, নির্মাণ, গাড়ি ধোয়া এবং সেবা খাতেও কাজের অধিকার যাচাই বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
২০২৫ সালে নিয়ম না মানা নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৪০০টির বেশি দেওয়ানি জরিমানা জারি করা হয়। জরিমানার মোট অঙ্ক ১৩ কোটি পাউন্ডের বেশি বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান
রিফর্ম ইউকের অভিবাসননীতির অংশ হিসেবেই নতুন প্রস্তাবটি সামনে এসেছে। দলটির পরিকল্পনায় অবৈধভাবে ব্রিটেনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত, আটক ও দেশে ফেরাতে পাঁচ বছর মেয়াদি জরুরি কর্মসূচি, নতুন প্রত্যাবাসন বিভাগ এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ থেকে ব্রিটেনকে প্রত্যাহারের অঙ্গীকার রয়েছে।
জুনে ইউসুফ দাবি করেছিলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার প্রথম বছরের মধ্যেই ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় অভিবাসীদের আসা বন্ধ করবে রিফর্ম। সীমান্তের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে একটি দেশের কার্যকর অস্তিত্ব থাকে না–এমন বক্তব্যও তাঁর।
তবে অবৈধ কর্মসংস্থান বন্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় মতভেদ না থাকলেও, প্রস্তাবিত শাস্তির মাত্রা ও দায় নির্ধারণের পদ্ধতি ঘিরেই বিতর্কের সম্ভাবনা বেশি। কর্মীর অবস্থান সম্পর্কে না জেনেও কোনো কর্তার কারাদণ্ড কতটা ন্যায়সংগত হবে, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানকে বিপুল জরিমানার মুখে পড়তে হবে কি না এবং জাতিগত বৈষম্য এড়াতে কী সুরক্ষা থাকবে–রিফর্মের সামনে এখন সেই সব প্রশ্ন।






