সেউতায় নতুন ভাসমান বেড়া বসাচ্ছে স্পেন

ছবি: রয়টার্স
স্পেনের উত্তর আফ্রিকার স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় অভিবাসীদের নজিরবিহীন অনুপ্রবেশের পর সীমান্ত পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। শনিবার রাতভর নতুন করে অনুপ্রবেশের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন সমুদ্রপথে ৫০০ মিটার দীর্ঘ ভাসমান বেড়া বসানোর কাজও শুরু করেছে দেশটি।
স্পেনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে সেউতায় প্রবেশ করেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্তে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রবেশের ঘটনা। তাদের মধ্যে ৪৮ হাজারের বেশি মানুষ ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আবার ফিরে গেছে মরক্কোয়।
শনিবার রয়টার্সের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ঘন কুয়াশায় ঢাকা তারাহাল সমুদ্রসৈকতে টহল দিচ্ছেন সেনা ও পুলিশ সদস্য। উপকূলের বেশির ভাগ এলাকাই তখন ফাঁকা ছিল।
স্পেন সরকার জানিয়েছে, শনিবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তারাহাল ব্রেকওয়াটারে নতুন ভাসমান প্রতিবন্ধক (ফ্লোটিং ফেন্স) বসানোর কাজ শুরু করে সিভিল গার্ড। বেশির ভাগ অনুপ্রবেশের চেষ্টা এই পথ দিয়েই হয়।
সরকারের ভাষ্য, নিউমেটিক এই ভাসমান বাধার সঙ্গে নোঙর করা বয়া যুক্ত থাকবে। পানির ওপর এর উচ্চতা হবে ৩০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার। নিচে থাকবে প্রায় এক মিটার পর্যন্ত। মাঝখানে একটি নির্দিষ্ট চ্যানেল রাখা হয়েছে, যাতে সিভিল গার্ডের টহল নৌযান চলাচল করতে পারে।
সীমান্ত অতিক্রমের সময় অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, কেউ পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার কেউ সীমান্তের ব্রেকওয়াটার ও বেড়া টপকাতে গিয়ে পদদলিত হয়েছেন। সব মরদেহ স্পেনের সীমান্ত অংশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব অনেককে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় উদ্বুদ্ধ করেছিল বলে ধারণা কর্তৃপক্ষের।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা বলেন, অসহায় অভিবাসীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে মানবপাচারকারী চক্র। তারা স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায় নিয়েও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়েছে। মানবপাচারকারী চক্র গুজব ছড়ায় যদি অভিবাসীদের এমন জায়গায় আটক করা হয়, যেখানে কোনো ভৌত সীমান্ত-প্রতিবন্ধক (যেমন সীমান্তের বেড়া) নেই, তাহলে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।
সেউতা সফরকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রয়োজন যত দিন থাকবে, তত দিন অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনা মোতায়েন থাকবে। তার আরও বলেছেন, রাতভর অনুপ্রবেশ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
মরক্কোকে স্পেনের ‘সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ বলেও উল্লেখ করেন গ্রান্দে-মারলাস্কা। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এত বড় অনুপ্রবেশের বিষয়ে আগে থেকে কোনো গোয়েন্দা সতর্কবার্তা ছিল না।
উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত সেউতা ও মেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারী অভিবাসীদের অন্যতম লক্ষ্য। সাম্প্রতিক এই ঘটনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
শনিবার ইইউর ২২টি সদস্যদেশ সেউতা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানায়। মরক্কো সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মাদ্রিদকে সহায়তার আহ্বানও জানানো হয়।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে শেনজেন অঞ্চল থেকে স্পেনকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন তিনি। ইতালি ইতোমধ্যে এক মাসের জন্য স্পেনের সঙ্গে শেনজেন ব্যবস্থা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে।
সানচেজ বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এমন স্বার্থপর, বিভাজনমূলক ও আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য ক্ষতিকর।
ইইউ সদস্যদেশগুলোর যৌথ চিঠিতে বলা হয়েছে, সেউতার এই অনুপ্রবেশ ইউনিয়নের বহিঃসীমান্তের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এতে ভবিষ্যতে আরও অবৈধ অভিবাসন উৎসাহিত হতে পারে। চিঠিতে সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের অতিরিক্ত সহায়তা এবং মরক্কোর সঙ্গে সহযোগিতার কাঠামো পর্যালোচনারও আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ ও পর্তুগাল ওই চিঠিতে সই করেনি।
স্পেন সরকার জানিয়েছে, অনিয়মিতভাবে সেউতায় প্রবেশকারীরা সেখান থেকে মূল ভূখণ্ড বা শেনজেন অঞ্চলের অন্য দেশে যেতে পারবেন না। সমুদ্র বা আকাশপথে সেউতা ছাড়ার সময় পুলিশ পরিচয় যাচাই করছে। মরক্কো সীমান্তের পর এটিকে দ্বিতীয় স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছে সরকার।
অভিবাসন নীতিতে ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় স্পেন তুলনামূলক উদার অবস্থানে রয়েছে। দেশটি পাঁচ লাখের বেশি অনথিভুক্ত অভিবাসীকে বৈধ বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কর্মসূচি চালু করেছে। তবে সরকার বলছে, এই কর্মসূচিই সেউতায় গণ-অনুপ্রবেশের কারণ—এমন দাবি সঠিক নয়। কারণ আবেদনকারীদের ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে স্পেনে বসবাসের প্রমাণ এবং আবেদন করার সময় টানা পাঁচ মাস অবস্থানের তথ্য দেখাতে হবে।




