সেউতা-ফেরতদের মুখে মৃত্যু, ক্ষুধা ও আতঙ্কের গল্প
নিখোঁজ সন্তান খুঁজছেন মায়েরা

ছবি: রয়টার্স
কারও জামাকাপড় তখনও সমুদ্রের নোনাজলে ভেজা। কেউ দিনের পর দিন ঠিকমতো খাবার পাননি। আবার কেউ ফিরে এসেছেন একা–যাঁদের সঙ্গে রওনা হয়েছিলেন, তাঁদের কেউ ডুবে গিয়েছেন, কেউ নিখোঁজ। স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতা থেকে মরক্কোয় ফিরে আসা অভিবাসীদের মুখে এখন মৃত্যু, ক্ষুধা ও আতঙ্কের একের পর এক বিবরণ। অন্যদিকে সীমান্তবর্তী ফনিদেকসহ মরক্কোর বিভিন্ন শহরে নিখোঁজ সন্তানদের ছবি হাতে অপেক্ষা করছেন উদ্বিগ্ন মায়েরা। হেসপ্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ফিরে আসা তরুণ ও তাঁদের পরিবারের এই মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবারের নজিরবিহীন ঢলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে সাঁতরে, পাথুরে উপকূল ঘুরে অথবা সীমান্তের বাধা পেরিয়ে সেউতায় ঢুকে পড়েছিলেন। প্রথম দফায় অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যুর খবর এলেও পরবর্তী হিসাবে মৃতের সংখ্যা অন্তত ৬৭-তে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। মরক্কোর সংবাদমাধ্যমে এ সংখ্যা ৮৪ । অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে ডুবে বা সীমান্তের ভিড়ে পদদলিত হয়ে। শনিবার স্পেন সেউতার উপকূলে ৫০০ মিটার দীর্ঘ ভাসমান প্রতিবন্ধক বসানোর কাজও শুরু করে।
এর আগেই ২৪ জুলাই হেসপ্রেস জানিয়েছিল, সেউতায় সাঁতরে যাওয়ার চেষ্টার পর অন্তত ১০ মরক্কোর নাগরিক–তাঁদের মধ্যে দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক–নিখোঁজ ছিলেন। এল জাদিদা, আগাদির, শেফশাওয়েন ও ফনিদেকের পরিবারগুলো তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর কথা জানিয়েছিল। কয়েক দিন পর মৃতের সংখ্যা ও নিখোঁজের তালিকা আরও বাড়তে থাকে। ২৭ জুলাই পর্যন্ত শুধু ওই উপকূলীয় পথে চলতি বছর অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল৷ নতুন ঢলের পর সেই হিসাব ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিও দেখে ফেজ শহরের বেকারি শ্রমিক ব্রাহিমও চাকরি ছেড়ে সেউতার পথে রওনা হয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, সীমান্ত পেরোতে পারলেই মূল স্পেনে পৌঁছে নতুন জীবন শুরু করা যাবে। কিন্তু সেউতায় গিয়ে তিন দিন শুধু পানি খেয়ে থাকতে হয়েছে বলে তিনি রয়টার্সকে জানান। তার প্রশ্ন, “একটি টুনা স্যান্ডউইচের দাম ১০০ দিরহাম কী করে হয়?”
ফিরে আসা আরেক শ্রমিকের ভাষায়, “সেউতা ছিল কারাগারের মতো, সেখানে করার কিছুই ছিল না, সব বন্ধ।” বহু দোকান ও সুপারমার্কেট বন্ধ থাকায় খাবার-পানির খোঁজে ঘুরেছেন অভিবাসীরা। কারও হাতে নগদ অর্থ ছিল না, কারও মোবাইল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভেজা কাপড় গায়ে অনেককে রাস্তার পাশে রাত কাটাতে হয়েছে।
কয়েকজন ফেরত আসা অভিবাসী সেউতার এল প্রিন্সিপে এলাকায় স্থানীয়দের হাতে ধাওয়া ও মারধরের অভিযোগ করেছেন। ইয়াসিন ইশু নামে এক মরক্কোর ওয়েটার বলেছেন, দোকানপাট বন্ধ রেখে তাঁদের চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। যদিও রয়টার্স এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পৃথক দুটি ছুরিকাঘাতের ঘটনায় দু’জন সামান্য আহত হন এবং একজন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; বৃহস্পতিবারের পর সেউতায় ছুরিকাঘাতে কোনও মৃত্যুর তথ্য মেলেনি।
তবে স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ছিল একরকম নয়। হার্ডওয়্যার দোকানের মালিক টিটো বলেন, এত মানুষের আকস্মিক আগমনে বাসিন্দারা আতঙ্কিত হলেও বহু মানুষ অভিবাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাঁর কথায়, এই তরুণদের “রাজনৈতিক দর-কষাকষির ঘুঁটি” হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে চার ঘণ্টা সাঁতরে সেউতায় পৌঁছানো সুদানের মোহাম্মদ আহমেদ ফিরে যেতে অস্বীকার করে বলেন, “ফিরব না, এখানেই চেষ্টা করতে করতে মরব।”
এই বিপুল ঢলের পেছনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের ভুল ও অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যাকে দায়ী করেছে মাদ্রিদ। কিন্তু রায়টি অনিয়মিতভাবে স্পেনে প্রবেশকে বৈধ করেনি, কাউকে থাকার অধিকারও দেয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর। এক আলজেরীয় নাগরিক আরও দু’জনের সঙ্গে সাঁতরে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করার সময় সমুদ্রে আটক হন এবং তাঁকে মরক্কোর কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করেন। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক বেঞ্চের পঞ্চম বিভাগ তাঁর পক্ষে রায় দেয়।
৮ জুলাই মাদ্রিদে প্রকাশিত রায়ে আদালত বলে, স্পেনের অভিবাসন আইনে সেউতা ও মেলিলার বিশেষ ‘সীমান্তে প্রত্যাখ্যান’ বিধান কেবল তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাঁরা বেড়ার মতো স্থলসীমান্তের ভৌত প্রতিবন্ধক অতিক্রমের চেষ্টা করেন। সমুদ্রে আটক সাঁতারুদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোয় ঠেলে দেওয়া যাবে না; তাঁদের জন্য আইনের নিয়মিত ফেরত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তবে ভবিষ্যতে সমুদ্রে আনুষ্ঠানিক সীমান্ত প্রতিবন্ধক স্থাপন করা হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলেও আদালত উল্লেখ করে।
অর্থাৎ রায়টির অর্থ ছিল, সমুদ্রপথে ধরা পড়লে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তাৎক্ষণিক ফেরত নয়; এটি কোনওভাবেই সেউতা থেকে মূল স্পেন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে অবাধ প্রবেশের অনুমতি নয়। সেউতা ও মেলিলা থেকে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার আগে বন্দর ও বিমানবন্দরে দ্বিতীয় দফা পরিচয় ও নথি পরীক্ষা চালু রয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা অভিযোগ করেছেন, মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কগুলো আদালতের রায়কে বিকৃতভাবে প্রচার করে অসহায় মানুষকে সীমান্তে টেনে এনেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পাচারকারীরা রায়ের “বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা” ছড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের প্ররোচিত করেছে।
স্পেনের তথ্য অনুযায়ী, ঢলের পর প্রথম দিনেই প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ মানুষ স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যান। তবু হাজার হাজার মানুষ তখনও সেউতায় অবস্থান করছিলেন; অভিবাসী গ্রহণকেন্দ্র পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় নতুনদের জায়গা দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না।
ফিরে আসা মানুষের ভিড় তাই বহু পরিবারের জন্য স্বস্তি আনলেও, নিখোঁজ সন্তানদের মায়েদের অপেক্ষা শেষ হয়নি। কেউ হাসপাতাল, কেউ পুলিশ স্টেশন, কেউ সীমান্তের ফেরতপথে ছেলের নাম খুঁজছেন। কারও হাতে শুধু মোবাইলে রাখা শেষ ছবি। সেউতার এই সংকট এখন আর কেবল সীমান্ত বা আইনের প্রশ্ন নয়–এটি ভুল তথ্য, হতাশ তরুণ সমাজ এবং সন্তানের খোঁজে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য পরিবারের এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি।






