অভিবাসী ঠেকাতে রণতরি নামানোর প্রস্তাব ব্রিটেনের বিরোধীদলের
- ক্ষমতায় এলে দু’সপ্তাহের মধ্যে ছোট নৌকার পারাপার বন্ধের দাবি রিফর্ম ইউকে নেতার; প্যারিসের পাল্টা বক্তব্য: অনুমতি ছাড়া ফরাসি জলসীমায় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রবেশ ‘অগ্রহণযোগ্য’

সংগৃহীত ছবি
আশ্রয়প্রার্থীদের বহনকারী ছোট নৌকা আটকাতে ইংলিশ চ্যানেলে ব্রিটিশ নৌবাহিনী নামানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ। তাঁর পরিকল্পনা–নৌকাগুলোকে মাঝসমুদ্রে আটক করে যাত্রীদের ফ্রান্স কিংবা বেলজিয়ামে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ফ্রান্স। প্যারিসের বক্তব্য, তাদের অনুমতি ছাড়া ফরাসি জলসীমায় প্রবেশ কিংবা ফরাসি উপকূলে মানুষ নামানোর চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইন ও ফ্রান্সের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হবে।
সোমবার (৩ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে ফারাজ তাঁর নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন ফোর্ট্রেস’, অর্থাৎ ‘দুর্গ অভিযান’। রিফর্ম ইউকের দাবি, দলটি ক্ষমতায় এলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংলিশ চ্যানেলে সবচেয়ে বড় ব্রিটিশ সামরিক মোতায়েন করা হবে। নৌবাহিনীর টহলজাহাজ ছোট নৌকাগুলোকে অনুসরণ করবে, আরোহীদের আটক করে খাবার, পানি ও চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পর নৌ-প্রহরায় ফ্রান্স বা বেলজিয়ামের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ফারাজের দাবি ছিল, রিফর্ম ইউকে সরকার গঠন করলে “দু’সপ্তাহের মধ্যে আর কোনও নৌকা থাকবে না”। ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় আশ্রয়প্রার্থীদের আগমনকে তিনি জাতীয় নিরাপত্তাজনিত জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে তুলে ধরেন। স্পেনের সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসী ঢলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সীমান্ত দুর্বল রাখার পরিণতি ইউরোপের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সোমবারই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ফরাসি সরকারের এক কর্মকর্তা পরিকল্পনাটিকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ফ্রান্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র; এমন এক মিত্র অনুমতি ছাড়া ফরাসি ভূখণ্ড বা জলসীমায় প্রবেশ করবে, প্যারিস তা প্রত্যাশা করে না। ফ্রান্সের মতে, তাদের সম্মতি ছাড়া ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজে করে কাউকে ফরাসি উপকূলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন–দুইয়েরই লঙ্ঘন হবে।
রিফর্ম ইউকের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। দলটির স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ ছোট নৌকার আরোহীদের সমুদ্রে বিপন্ন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করে উদ্ধার করা হবে। ফ্রান্স তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে রাজি না হলেও ব্রিটিশ বাহিনী তাঁদের ফরাসি উপকূলের দিকে ফিরিয়ে নেবে, এমন কথাও তিনি বলেছেন। ফারাজ আবার দাবি করেন, পরিকল্পনাটি নিয়ে ফ্রান্সের অবস্থান নরম হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে; তবে প্যারিস সহযোগিতা করবে, এমন নিশ্চয়তা তিনি দিতে পারেননি।
এই জায়গাতেই পরিকল্পনাটির সবচেয়ে বড় ফাঁক দেখছেন আইনজ্ঞেরা। ব্রিটেনের যুদ্ধজাহাজ ফরাসি সরকারের অনুমতি ছাড়া ফ্রান্সের আঞ্চলিক জলসীমায় ঢুকতে, নৌকা জব্দ করতে কিংবা ক্যালের মতো কোনও ফরাসি বন্দরে যাত্রী নামাতে পারে না। হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির গবেষক এবং সাবেক ব্রিটিশ প্যারাট্রুপার অ্যান্ড্রু ফক্সের মতে, ফ্রান্সের অনুমতি না পাওয়াটাই প্রস্তাবটির কেন্দ্রীয় দুর্বলতা।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, সমুদ্রে বিপন্ন যে কোনও মানুষকে উদ্ধার করা জাহাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু উদ্ধার করার দায়িত্ব মানেই উদ্ধার হওয়া মানুষকে যে কোনও দেশের উপকূলে তার অনুমতি ছাড়া নামিয়ে দেওয়ার অধিকার নয়। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংগঠনের সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত এমন নিরাপদ স্থানে নামাতে হবে, যেখানে তাঁদের জীবন, মানবাধিকার এবং আশ্রয় চাওয়ার অধিকার ঝুঁকিতে পড়বে না।
অভিবাসন আইনজীবী কলিন ইয়োর মতে, ফ্রান্সের সম্মতি ছাড়া সশস্ত্র ব্রিটিশ বাহিনীর কাউকে ফরাসি উপকূলে নিয়ে যাওয়া দেশটির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির গবেষক পিটার ওয়ালশও সতর্ক করেছেন, এমন পদক্ষেপের জেরে ফ্রান্স গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সৈকত পাহারা এবং মানবপাচারবিরোধী যৌথ অভিযান স্থগিত করতে পারে। পরিস্থিতি চরমে উঠলে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ নৌযানকে বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করতে পারে।
পরিকল্পনাটির বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা। অবসরপ্রাপ্ত রয়্যাল নেভি কমান্ডার টম শার্প সোমবার (৩ আগস্ট) বিবিসি রেডিও ফোরের ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিমান বা সাবমেরিনের হুমকি মোকাবিলার জন্য তৈরি শতকোটি পাউন্ডের যুদ্ধজাহাজকে মানুষ পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা যুক্তিসঙ্গত নয়। তাঁর মতে, এই কাজের জন্য যুদ্ধজাহাজের বদলে ফেরি ব্যবহার করাই বাস্তবসম্মত হতো। তিনি আরও বলেছেন, বর্তমানে চলমান সামরিক দায়িত্বের মধ্যে রয়্যাল নেভির হাতে এমন অভিযানের জন্য পর্যাপ্ত উপযুক্ত জাহাজও নেই।
ব্রিটিশ নৌবাহিনী এর আগেও ছোট নৌকার পারাপার ঠেকানোর দায়িত্ব পেয়েছিল। ২০২২ সালের ‘অপারেশন আইসোট্রোপ’-এর সময় নৌকাগুলোকে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু প্রাণহানির ঝুঁকি, আইনি বাধা ও ফ্রান্সের সহযোগিতার অনিশ্চয়তায় তথাকথিত ‘পুশব্যাক’ পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়নি। সমালোচকদের মতে, রিফর্মের নতুন প্রস্তাবটি ‘পুশব্যাক’-এর বদলে ‘উদ্ধার ও ফেরত’ শব্দ ব্যবহার করলেও মূল আইনি ও কূটনৈতিক সমস্যাগুলো একই রয়ে গেছে।
ইংলিশ চ্যানেলের অভিবাসন সমস্যা মোকাবিলায় ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ইতিমধ্যেই একটি ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। পরীক্ষামূলক ‘একজন ফেরত, একজন বৈধ পথে গ্রহণ’ চুক্তির আওতায় ছোট নৌকায় ব্রিটেনে যাওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট শর্তে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়; বদলে ফ্রান্সে থাকা সমসংখ্যক যোগ্য আবেদনকারী বৈধ পথে ব্রিটেনে যেতে পারেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ১৩ জুলাই দেওয়া সরকারি উত্তরে জানানো হয়, এ ব্যবস্থায় এক হাজারের বেশি মানুষকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং পরীক্ষামূলক প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দুই দেশের যৌথ অভিযানে বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ৪৪ হাজারের বেশি পারাপারের চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে। ফরাসি সৈকতে আইনশৃঙ্খলা, গোয়েন্দা ও সামরিক সদস্যের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বাড়ানোর নতুন ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ফ্রান্সের সম্মতি ছাড়া নৌবাহিনী পাঠানোর চেষ্টা হলে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই সহযোগিতা ভেঙে পড়তে পারে–আর তাতে ছোট নৌকার পারাপার কমার বদলে উল্টো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিই থাকবে।
*রাজনীতির চাপও কি কাজ করছে?*
রিফর্ম ইউকের ঘোষণাটি এমন সময়ে এসেছে, যখন দলটি জনমত জরিপে আগের অবস্থান হারাচ্ছে এবং দলের শীর্ষ নেতাদের অর্থ ও অনুদান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লেবার পার্টির অভিযোগ, আর্থিক বিতর্ক থেকে মনোযোগ সরাতেই পুরনো অভিবাসন পরিকল্পনাকে নতুন সামরিক মোড়কে হাজির করেছেন ফারাজ। রিফর্ম অবশ্য বলছে, ইংলিশ চ্যানেলের পারাপার বন্ধ করতে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার কারণেই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ব্রিটেনের বর্তমান সরকারও চাপে রয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই সপ্তাহেই দুই হাজারের বেশি মানুষ ছোট নৌকায় ব্রিটেনে পৌঁছেছেন। তিনি পারাপার বন্ধে “নিরলস” ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও রিফর্মের সামরিক পরিকল্পনাকে কার্যকর সমাধান হিসেবে সরকার গ্রহণ করেনি।
ফারাজের পরিকল্পনার রাজনৈতিক আবেদন স্পষ্ট–সীমান্তে দৃশ্যমান শক্তি প্রদর্শন, দ্রুত ফলের প্রতিশ্রুতি এবং ফ্রান্সকে দায়ী করা। কিন্তু সমুদ্রের আইন, আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার, ফরাসি সার্বভৌমত্ব এবং রয়্যাল নেভির সামর্থ্য–চারটি প্রশ্নের কোনওটিরই পূর্ণ উত্তর এখনও দেয়নি রিফর্ম ইউকে।
প্যারিসের আপত্তি তাই শুধু অভিবাসীদের ফেরত নেওয়া নিয়ে নয়। ফরাসি সরকারের চোখে প্রশ্নটি আরও মৌলিক, একটি মিত্রদেশ কি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে অন্য মিত্রের জলসীমায় নৌবাহিনী পাঠাতে পারে?
রিফর্ম বলছে, দু’সপ্তাহেই নৌকার পারাপার বন্ধ হবে। অথচ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ফরাসি সম্মতি ছাড়া সেই অভিযান শুরু হলে পারাপার বন্ধ হওয়ার আগে লন্ডন-প্যারিসের কূটনৈতিক সহযোগিতাই থমকে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই–ইংলিশ চ্যানেলকে সুরক্ষিত করা হবে পারস্পরিক সমঝোতায়, না কি অভিবাসন ঠেকানোর নামে মিত্র দুই দেশের মাঝেই খুলে যাবে নতুন সংঘাতের জলসীমা?




