নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ দুই আইরিশ নাগরিক

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিখোঁজ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে রয়েছেন দুই আইরিশ নাগরিক। মাউন্ট কৈলাশের উদ্দেশে যাওয়া একটি পর্যটক দলের সদস্য ছিলেন তারা। গত ২৬ আগস্ট সকালে ওই দলের সঙ্গে শেষবার যোগাযোগের পর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।
দুই আইরিশ নাগরিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আয়ারল্যান্ডে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবার ও স্বজনেরা তাদের খবরের অপেক্ষায় রয়েছেন। দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্টদের কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার জন্য নেপাল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক এই দুর্যোগ আঘাত হানে। প্রবল পানির স্রোতের সঙ্গে কাদা, পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ করে দেয়। নেপালের রসুয়া জেলা এবং চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিরং এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে সড়ক ও সেতু ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। নেপালেই নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। তা দের মধ্যে কয়েক শ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ৩০টির বেশি দেশের নাগরিক এই দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ভারতীয় নাগরিকদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজ দুই আইরিশ নাগরিক নেপালভিত্তিক পর্যটন প্রতিষ্ঠান আলপিন ইকো ট্রিকের পরিচালিত একটি গাইডেড ট্যুরে ছিলেন। তাদের গন্তব্য ছিল তিব্বতের মাউন্ট কৈলাশ। একই দলের ১২ জন ব্রিটিশ এবং চারজন দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। দলের কয়েকজন নেপালি গাইডও নিখোঁজ রয়েছেন।
পর্যটন প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলটি নেপাল থেকে তিব্বতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। স্থানীয় সময় সকাল আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটে দলের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। এরপর তাদের মোবাইল ফোনগুলো আর সক্রিয় পাওয়া যায়নি। সীমান্ত এলাকায় আকস্মিক বন্যা আঘাত হানার পর যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পর্যটকদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মাউন্ট কৈলাশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও পর্যটন গন্তব্য। বিশেষ করে ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রী এই অঞ্চলে যান। নেপাল হয়ে তিব্বতের দিকে যাওয়ার পথটিও বিদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। ফলে এবারের দুর্যোগে স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
দুর্যোগের পর নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ নিখোঁজ পর্যটকদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে। পর্যটন পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন পর্যটন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে তালিকা বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। অনেক সড়ক ধসে পড়েছে, ভেসে গেছে সেতু। ফলে দুর্গম এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো যাচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার ও অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে।
নেপালের এই বিপর্যয় বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। হিমালয়ের পর্যটন ও তীর্থপথগুলোর বড় অংশ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। অনেক জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সীমিত এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থাও শহরাঞ্চলের মতো দ্রুত নয়। আকস্মিক বন্যা বা ভূমিধসের মতো ঘটনায় কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। ফলে পর্যটকরা বিপদে পড়লে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিজ নিজ দেশের সরকার ও পরিবারের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এবারের ঘটনায় সেই বাস্তবতাই সামনে এসেছে। দুই আইরিশ নাগরিকের সঙ্গে শেষ যোগাযোগের পর তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় আয়ারল্যান্ডের স্বজনদের উদ্বেগ বাড়ছে। একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশের নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারগুলোও।
আয়ারল্যান্ডের ডেপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স জানিয়েছে, তারা নেপালের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিদেশে থাকা আইরিশ নাগরিকদের কোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে পড়ার খবর পাওয়া গেলে কনস্যুলার সহায়তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পরিবার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়। তবে ব্যক্তিগত কনস্যুলার মামলার ক্ষেত্রে নাগরিকদের পরিচয় বা অবস্থান সম্পর্কে সরকার সাধারণত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না।
এদিকে নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে আইরিশ রেড ক্রস। সংস্থাটি নেপাল রেড ক্রস সোসাইটির সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগটির কারণ নিয়েও নতুন তথ্য সামনে এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটনাটি ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে হিমবাহ ও পাহাড়ি বরফ-পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট প্রবল স্রোতকে দুর্যোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই স্রোতের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে নদী ও উপত্যকার দিকে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগ নতুন নয়। তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বড় উপস্থিতি থাকায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে হিমালয়ের জনপ্রিয় পর্যটন রুটগুলোতে আগাম সতর্কতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
আয়ারল্যান্ডে এখন মূল নজর দুই নিখোঁজ নাগরিককে ঘিরে। তাঁদের পরিবার ও স্বজনেরা নেপাল ও তিব্বতের উদ্ধার তৎপরতার দিকে তাকিয়ে আছেন। ডাবলিন থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং নতুন তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই ভয়াবহ দুর্যোগ ইতোমধ্যে একটি বড় আন্তর্জাতিক মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। শত শত বিদেশি নাগরিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার তাঁদের নাগরিকদের অবস্থান নিশ্চিত করতে নেপাল ও তিব্বতের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। সেই আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই এখন নেপালের দুর্গম পাহাড়ে চলছে দুই আইরিশ নাগরিকের সন্ধান।
প্রকৃতির ভয়াবহতার মধ্যে তাদের অবস্থান এখনো অজানা। আর আয়ারল্যান্ডে অপেক্ষা করছেন তাদের পরিবার কখন আসে কোনো নিশ্চিত খবর।







