পাইরেসির ভয়ে ব্রিটেনের সিনেমা হলে নিষিদ্ধ হতে পারে ‘মেটা গ্লাস’

চলচ্চিত্র পাইরেসির সেই আশঙ্কায় মেটার স্মার্ট গ্লাসের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার কথা ভাবছে ব্রিটেনের বড় সিনেমা হলগুলো।
বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ চশমা। কিন্তু ফ্রেমের ভেতরেই ক্যামেরা। চোখের সামনে যা ঘটছে, হাত না দিয়েই তা ছবি বা ভিডিও করে রাখা সম্ভব। আর সেখানেই নতুন দুশ্চিন্তা ব্রিটেনের সিনেমা হলগুলোর৷ দর্শক যদি এমন চশমা পরে হলে ঢুকে গোটা ছবিই রেকর্ড করে ফেলেন? চলচ্চিত্র পাইরেসির সেই আশঙ্কায় মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত স্মার্ট গ্লাসের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার কথা ভাবছে ব্রিটেনের বড় সিনেমা হলগুলো।
বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এসেছে। ব্রিটেনের সিনেমা হল ব্যবসার প্রধান সংগঠন ইউকে সিনেমা অ্যাসোসিয়েশন (ইউকেসিএ) জানিয়েছে, ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট গ্লাসের ব্যবহার নিষিদ্ধ অথবা নিয়ন্ত্রণে আলাদা নীতি আনার বিষয়টি বিবেচনা করছে দেশটির প্রধান সিনেমা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ইউকেসিএ-র সদস্যদের দখলেই ব্রিটেনের সিনেমা হল বাজারের ৯০ শতাংশের বেশি। ফলে শেষ পর্যন্ত কড়াকড়ি এলে তার প্রভাব পড়তে পারে দেশটির প্রায় গোটা সিনেমা ব্যবসাতেই। তবে এখনও কোনও সিনেমা হল আনুষ্ঠানিক ভাবে মেটা গ্লাস নিষিদ্ধ করেছে বলে ইউকেসিএ-র জানা নেই।
দুশ্চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে চশমার ফ্রেমে বসানো ক্ষুদ্র ক্যামেরা। সেটি দিয়ে খুব সহজেই ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করা যায়। রেকর্ডিংয়ের সময় ছোট একটি আলো জ্বলে উঠলেও সাধারণ মোবাইল ফোনের তুলনায় স্মার্ট গ্লাস দিয়ে যে অনেক বেশি নিঃশব্দে দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব, তা নিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে। এই কারণেই সমালোচকদের একাংশ ইতিমধ্যে এগুলোকে ‘স্পাই গ্লাস’ বলছেন। সিনেমা হলগুলোর ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন প্রশ্ন, এই প্রযুক্তি কি সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা গোপনে ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার পথ আরও সহজ করে দেবে?
তবে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে বেশ কঠিন সমীকরণ মেলাতে হচ্ছে হলমালিকদের। কারণ এই চশমা শুধু ভিডিও ধারণের যন্ত্র নয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং কম শুনতে পাওয়া অনেক মানুষের কাছেও প্রযুক্তিটি সহায়ক হতে পারে। ইউকেসিএ-র প্রধান নির্বাহী ফিল ক্ল্যাপ জানিয়েছেন, কিছু স্মার্ট গ্লাস দর্শকের জন্য বিশেষ সাবটাইটেলের সুবিধাও দিতে পারে। ফলে পাইরেসি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকি ঠেকাতে গিয়ে এমন দর্শকদের প্রয়োজনীয় সুবিধা যেন কেড়ে নেওয়া না হয়, সেই ভারসাম্যও রাখতে চাইছে সিনেমা শিল্প।
স্মার্ট গ্লাস নতুন প্রযুক্তি না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে মেটার তৈরি চশমার জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। মেটার সঙ্গে অংশীদারত্বে তৈরি রে-ব্যান ও ওকলি-সহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত চশমা ২০২৫ সালেই ৭০ লাখের বেশি বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছে মেটার অংশীদার এসিলরলাক্সোটিকা। আমেরিকান গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কাইলি জেনারকে সামনে রেখে চালানো প্রচারও নতুন করে এই চশমাকে আলোচনায় এনেছে।
এগুলো দিয়ে শুধু ছবি বা ভিডিও করাই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথোপকথন, গান শোনা ও ফোনকল করাও যায়। নতুন কিছু মডেলের ডান দিকের লেন্সে ছোট পর্দাও রয়েছে। সেখানে ফোন বের না করেই বার্তা পড়া, কথোপকথনের অনুবাদ দেখা কিংবা মানচিত্র অনুসরণ করার মতো কাজ করা যায়। মেটা ও এসিলরলাক্সোটিকা এ বছর আরও নতুন নকশার স্মার্ট গ্লাস এবং সরাসরি অনুবাদ-সহ একাধিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সুবিধা যোগ করার কথাও জানিয়েছে।
কিন্তু প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা যত বাড়ছে, ব্রিটেনে ততই বাড়ছে তার বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ। ইতিমধ্যে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাবশৃঙ্খল ওয়েদারস্পুনস তাদের পাবে মেটা গ্লাস ব্যবহার করে অন্যদের রেকর্ড করতে দিচ্ছে না। লন্ডনের একাধিক থিয়েটার, এডিনবরা প্লেহাউস ও ব্রিস্টল হিপোড্রোম পরিচালনাকারী এটিজি থিয়েটার্সও অনুষ্ঠান চলাকালে এই চশমায় রেকর্ডিং বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রেস্তোরাঁ ও ব্যক্তিগত ক্লাবগুলোর একাংশও একই পথে হাঁটছে।
আরও এক ধাপ এগিয়েছে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আদালত। আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ভিতরে ছবি বা ভিডিও ধারণে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় সেখানে মেটা গ্লাসের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এইচএম কোর্টস অ্যান্ড ট্রাইব্যুনালস সার্ভিস। কেউ এমন চশমা নিয়ে আদালতে গেলে প্রবেশের সময় সেটি জমা রাখতে হবে এবং বের হওয়ার সময় ফেরত দেওয়া হবে।
তবে সমালোচনার মুখে মেটা বলছে, গোপনে ভিডিও করার আশঙ্কা ঠেকাতে তাদের চশমায় রেকর্ডিং চালু হলে আশপাশের মানুষকে জানানোর জন্য আলো জ্বলে ওঠে। সেই আলো ঢেকে রেকর্ড করার চেষ্টা ঠেকাতেও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়মিত উন্নত করা হচ্ছে। সংস্থাটির আরও দাবি, দৃষ্টিহীন ও স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের জন্য এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়ে উঠছে। তাই এর ব্যবহার ব্যাপক ভাবে সীমিত করা হলে তা প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়া হবে। তবে যেখানে কোনও ধরনের ছবি বা ভিডিও ধারণ করা উচিত নয়, সেখানে বিধিনিষেধ থাকা যুক্তিসঙ্গত বলেও স্বীকার করেছে মেটা।
এখন তাই ব্রিটেনের সিনেমা শিল্পের সামনে প্রশ্ন, চশমাটি দেখে দর্শককে আটকানো হবে, না কি শুধু রেকর্ডিং নিষিদ্ধ করা হবে? চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। কিন্তু মোবাইল ফোন লুকিয়ে সিনেমা রেকর্ড করার পুরনো লড়াইয়ের মধ্যেই নতুন মাথাব্যথা যে এসে হাজির হয়েছে, তা স্পষ্ট৷ কারণ, এ বার ক্যামেরা পকেটে নয়, সরাসরি দর্শকের চোখের সামনে।






