পুতিনের আগ্রাসন, ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা
বিপদ সামলাতে ব্রিটেনকে ইইউতে ফেরার পরামর্শ গবেষকদের
- ব্রেক্সিটের দশ বছর পর নতুন সমীকরণ, পুনরায় সদস্যপদের পক্ষে ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক

ব্রেক্সিটে ইউরোপের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছিল। দশ বছর পর সেই বিচ্ছেদের হিসাব কষছে ব্রিটেন। একদিকে রাশিয়ার আগ্রাসন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতি। সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক চাপ। একা পথ চলা বিপজ্জনক বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। তাদের পরামর্শ, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি বাঁচাতে ইউরোপিয় ইউনিয়নে ফেরার প্রস্তুতি নিক লন্ডন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি রিসার্চ নতুন প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে এই পরামর্শ দিয়েছে। একই দিনে প্রকাশিত গবেষণাটির বক্তব্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্যপদ ফিরিয়ে আনাকে ব্রিটেনের মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য করা উচিত। তবে এখনই নতুন গণভোট ঘোষণার দাবি করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
গবেষকদের যুক্তি, ২০১৬ সালের গণভোটের সময়কার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আর নেই। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা বদলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি বেড়েছে। চীনও অর্থনৈতিক প্রভাব খাটাচ্ছে। ইউরোপিয় ইউনিয়ন এখন শুধু বাণিজ্যের জোট নয়, প্রতিরক্ষা, শিল্পনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থারও শক্তি হয়ে উঠছে।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হ্যারি কুইল্টার-পিনার বলেছেন, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতে সরকার অগ্রগতি করেছে। কিন্তু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন চুক্তি যথেষ্ট নয়। তার ভাষায়, ‘ইউরোপের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্কের সবচেয়ে ভালো পথ সদস্যপদ।’ এজন্য দেশে ও ইউরোপে রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি করতে হবে।
সহযোগী পরিচালক লরা চ্যাপেলের বক্তব্য, ‘ব্রেক্সিট নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সময় এসেছে।’ জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো, শিল্প পুনরুজ্জীবন কিংবা নিরাপত্তা রক্ষায় ব্রিটেন একা যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিবেদনে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা জোট গড়ার প্রস্তাব রয়েছে। উপগ্রহ যোগাযোগের মতো প্রযুক্তিতে যুক্তরাজ্য সহযোগিতা দিতে পারে। পাশাপাশি দুই পক্ষের সরকারি কেনাকাটার বাজার একে অন্যের প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটেন চাইলে ইউরোপের প্রতিরক্ষাশিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সদস্যপদ পেতে রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। ব্রিটেনের জনগণের সমর্থনের পাশাপাশি ইউরোপীয় অংশীদারদের আস্থাও অর্জন করতে হবে।
জনমত জরিপে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফেরার পক্ষে, ২৯ শতাংশ বিপক্ষে। সিদ্ধান্তহীন ১০ শতাংশ। ভোট দেবেন না বলেছেন ৯ শতাংশ। শুধু মত দেওয়া ব্যক্তিদের হিসাবে সমর্থন ৬৪ শতাংশ, বিরোধিতা ৩৬ শতাংশ। জরিপটি জুনে পরিচালিত হয়। অংশ নেন তিন হাজারের বেশি মানুষ। তবে অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগের বক্তব্য সামনে আনলে সমর্থনের হার কমে যাওয়ার প্রবণতাও পাওয়া গেছে। গবেষকেরা তাই জনসমর্থনকে স্থায়ী ধরে না নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন। লেবার থেকে নাইজেল ফারাজের রিফর্ম দলে যাওয়ার কথা ভাবছেন, এমন ভোটারদের মধ্যেও ৫৪ শতাংশ পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
সাবেক লেবার নেতা নিল কিনক গবেষণার সুপারিশ সমর্থন করেছেন। সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী নিক বোলসও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে সরকারের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে উচ্চাভিলাষী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার কাজ চলছে। বার্নহ্যাম ভবিষ্যতে সদস্যপদ নিয়ে গণভোটের সম্ভাবনা নাকচ করেননি, তবে চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতিও দেননি। ইতিমধ্যে আগামী নভেম্বরে দুই পক্ষের শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। সেই বৈঠকে নতুন বাণিজ্য ও সহযোগিতার পথ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
ব্রেক্সিটের দেয়াল একদিনে ওঠেনি। তা ভাঙার সিদ্ধান্তও রাতারাতি আসবে না। কিন্তু যে বিচ্ছেদ একসময় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আজ তার সামনে প্রশ্ন, বৃহৎ শক্তিগুলোর টানাপোড়েনে একা থেকে ব্রিটেন কতটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?



