আবাসন সংকটে উত্তাল পর্তুগাল
- লিসবনে ৫৫ জন আটক
- ফ্রান্সের মতো অস্থিরতার শঙ্কা

পর্তুগালের লিসবনে আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১৯ অক্টোবর রসিও স্কয়ারে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন বিক্ষোভকারীরা।
বাড়িভাড়ার লাগামহীন বৃদ্ধি ও তীব্র আবাসন সংকটের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপের দেশ পর্তুগাল। রাজধানী লিসবনসহ পোর্তো, কোইমব্রা, এভোরা ও দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযানে লিসবন থেকে ৫৫ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় দুজন সামান্য আহত হয়েছেন। তবে পুলিশি অভিযানের পরও আন্দোলন থামেনি বরং নতুন করে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর ৬টার আগে লিসবনের ঐতিহাসিক রসিও (Rossio) চত্বরে অভিযান চালায় পর্তুগালের জননিরাপত্তা পুলিশ (PSP)। আবাসনের অধিকারের দাবিতে গত শনিবার থেকে সেখানে প্রায় ২০০টি তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান করছিলেন আন্দোলনকারীরা। পুলিশের নির্দেশে স্থান ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানালে ৫৫ জনকে আটক করা হয়।পরে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অমান্যের অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এদিকে পর্তুগালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পোর্তোতে প্রায় ১০ দিন ধরে চলা অবস্থান কর্মসূচিও মঙ্গলবার ভোরে শেষ হয়। পুলিশের অভিযানের আশঙ্কায় বিক্ষোভকারীরা নিজেরাই তাঁবু সরিয়ে নেন।
পুলিশি অভিযানের পর আরও জোরালো আন্দোলন
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লিসবনে আবারও হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। লিসবনের সমাবেশে আন্দোলনকারীরা বুধবার থেকে রসিও চত্বরে পুনরায় তাঁবু স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য শহরেও। মঙ্গলবার রাতে কোইমব্রায় চার শতাধিক, এভোরায় প্রায় একশ এবং লেইরিয়া ও বেজায় প্রায় ৫০ জন করে বিক্ষোভে অংশ নেন। পোর্তোতে আগামী শনিবার আরও বড় বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
আবাসন সংকটের নেপথ্যে কী?
পর্তুগালে গত কয়েক বছরে বাড়ির দাম ও ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর দেশটিতে বাড়ি কেনার মূল্য দ্বিগুণের বেশি হয়েছে এবং নতুন ভাড়াচুক্তির ক্ষেত্রে ভাড়াও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশেষ করে লিসবন ও পোর্তোর মতো বড় শহরে সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থান পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারের প্রস্তাবিত নতুন ভাড়াসংক্রান্ত আইন বাড়িওয়ালাদের সুবিধা দেবে এবং ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ সহজ করবে। তাঁরা আইনটির প্রস্তাবিত পরিবর্তন প্রত্যাহার, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত এবং সাধারণ মানুষের বাসস্থানের অধিকার রক্ষার দাবি জানাচ্ছেন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
লিসবনে পুলিশের অভিযানের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। তবে পর্তুগালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুইস নেভেস পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেছেন, বিক্ষোভের অধিকার থাকলেও আইন মেনে চলতে হবে। পুলিশও দাবি করেছে, আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা?
সম্প্রতি ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে পর্তুগালের চলমান আবাসন আন্দোলনও নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তবে বুধবার পর্যন্ত পর্তুগালে ফ্রান্সের মতো ব্যাপক সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্দোলনকারীরা নতুন করে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করতে চাইছেন, অন্যদিকে সরকার জনসমাগমস্থলে অননুমোদিত তাঁবু স্থাপনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে পর্তুগালের আবাসন সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা
অনেকাংশে নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্দোলনকারীদের কর্মসূচির ওপর।



