ইরান যুদ্ধের আঁচ ব্রিটেনের পেট্রোল পাম্পগুলোতে
- প্রতিদিন চুরি হচ্ছে ২ লক্ষ পাউন্ডের
- বিপাকে ছোট পেট্রোল পাম্প মালিকরা
- জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে ‘ভরো আর পালাও’ ঘটনা

ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ এবার পৌঁছল ব্রিটেনের পেট্রোল পাম্পগুলোতে। ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাজ্যে জ্বালানি চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সোমবার (৩ আগস্ট) প্রকাশিত ফোরকোর্ট আই-এর সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পরবর্তী পাঁচ মাসে ব্রিটিশ পেট্রোল পাম্পগুলোতে টাকা না দিয়ে জ্বালানি নিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনা আগের পাঁচ মাসের তুলনায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লক্ষ ৯৪ হাজার পাউন্ড মূল্যের জ্বালানি চুরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি চুরি প্রতিরোধকারী সংস্থাটি।
সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বাড়ায় চুরি হওয়া জ্বালানির আর্থিক মূল্যও দ্রুত বেড়েছে। শুধু চুরির সংখ্যা নয়, চুরি হওয়া জ্বালানির মোট মূল্য আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি।
দাম বাড়ছে, বাড়ছে ‘ফুয়েল রানার’
ব্রিটেনে পেট্রোল পাম্পের ভাষায় ‘ফুয়েল রানার’ বলতে বোঝায় এমন গ্রাহকদের, যাঁরা গাড়িতে জ্বালানি ভরার পর টাকা না দিয়েই চলে যান।
ফোরকোর্ট আই-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবার অপরাধ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। নতুন অপরাধীদের মধ্যে জ্বালানি চুরির ঘটনা প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর চুরি হওয়া জ্বালানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। একই সময়ে বারবার অপরাধ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ঘটনা বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।
এই তথ্য নেওয়া হয়েছে ব্রিটেনের প্রায় ৫৫০টি পেট্রোল পাম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে। এর মধ্যে রয়েছে সরাসরি টাকা না দিয়ে চলে যাওয়া এবং জ্বালানি নেওয়ার পর “পেমেন্ট করার কোনও উপায় নেই” বলে দাবি করা ঘটনাও।
এক লিটারের দামেই বদলে যাচ্ছে ছবি
ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্রিটেনের জ্বালানির বাজারেও।
জুলাইয়ের শেষ দিকে ব্রিটেনে পেট্রোলের গড় দাম পৌঁছেছিল প্রায় প্রতি লিটারে ১৬০ পেন্সে। যা সংঘাতের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ২৭ পেন্স বেশি। ডিজেলের দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৯ পেন্স প্রতি লিটার, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৩৭ পেন্স বেশি।
ব্রিটিশ সরকারের প্রতিযোগিতা ও বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কম্পিটিশন অ্যান্ড মার্কেটস অথরিটি (সিএমএ) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পাইকারি জ্বালানির দাম বৃদ্ধিই পাম্পের দামের প্রধান কারণ। যদিও সংস্থাটি খুচরা বাজারে প্রতিযোগিতার দুর্বলতা নিয়েও নজর রাখছে।
“এটি শুধু অপরাধ নয়, ছোট ব্যবসার বড় ক্ষতি”
ব্রিটেনের স্বাধীন পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন পেট্রোল রিটেইলার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর নির্বাহী পরিচালক গর্ডন বালমার বলেছেন, কর্মীরা শুধু তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাঁদের হাতে নেই। অথচ মূল্যবৃদ্ধির চাপের সঙ্গে তাঁদেরই অপমান ও আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বালমারের মতে, প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধ ঠেকানোর ব্যবস্থা তৈরি করা এখন জরুরি। ফোরকোর্ট আই ইতিমধ্যেই ফেসওয়াচ-এর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে, যাতে দোকান ও পেট্রল পাম্প মালিকেরা অপরাধের তথ্য নথিবদ্ধ করতে পারেন এবং সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা সহজ হয়।
ব্রিটেনের পাঁচটি পেট্রোল স্টেশনের মালিক বেন লরেন্স বলেন, আগে জ্বালানি চুরি সাধারণত সংগঠিত অপরাধীদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে এখন ছবিটা বদলেছে।
তাঁর কথায়, অনেক মানুষ ভুল ধারণা করেন–বড় তেল সংস্থার নাম লেখা পাম্প থেকে জ্বালানি চুরি করলে ক্ষতি শুধু সেই সংস্থার হবে। কিন্তু বাস্তবে বহু পাম্প ছোট ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন।
তিনি বলেন, কেউ যদি ৮০ বা ৯০ পাউন্ডের জ্বালানি নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে যান, ক্ষতি হয় সেই স্থানীয় ব্যবসায়ীরই।
ব্রিটেনের অনেক পেট্রোল স্টেশনে বিপি বা শেলের মতো বড় সংস্থার নাম দেখা গেলেও সব পাম্প সেই সংস্থার মালিকানাধীন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বড় ব্র্যান্ডের অধীনে পাম্প পরিচালনা করেন। ফলে জ্বালানি চুরির ক্ষতি সরাসরি পড়ছে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর।
বার্মিংহামের একটি পেট্রোল স্টেশনের মালিক শৈলেশ পারেখ জানিয়েছেন, আগে জ্বালানি চুরি ছিল বিরল ঘটনা। কিন্তু এখন প্রায় নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর ছয়টি পাম্পে গত বছর জ্বালানি চুরির কারণে ক্ষতি হয়েছে ৪০ হাজার পাউন্ডের বেশি।
পারেখ বলেছেন, এখন অপরাধীরা আর আগের মতো লুকিয়ে আসে না। কেউ দামি গাড়িতে আসে, কেউ কাজের পোশাক পরে আসে। তাঁর ভাষায়, অনেকের মধ্যে “কোনও ভয় নেই”।
হরমুজ খুললে কি মিলবে স্বস্তি?
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এই পথ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিশ্ব বাজারে চাপ কিছুটা কমতে পারে। এর ফলে ইউরোপের সাধারণ মানুষের জ্বালানি খরচও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ব্রিটেনের পেট্রোল পাম্প মালিকদের জন্য সমস্যা শুধু জ্বালানির দাম নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ছোট ব্যবসার খরচ এবং অপরাধ–সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন চাপ।
যুদ্ধের গোলা এখনও মধ্যপ্রাচ্যে পড়ছে, কিন্তু তার অভিঘাত পৌঁছে গিয়েছে ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের গাড়ির ট্যাঙ্কে এবং ছোট ব্যবসায়ীদের হিসাবের খাতায়।






