জেরুজালেমে কনস্যুলেট বন্ধ করলে ইসরায়েলি কূটনীতিকদের বহিষ্কারের হুঁশিয়ারি ব্রিটেনের
- লন্ডন ছাড়তে হতে পারে ২৭ ইসরায়েলি কূটনীতিককে
- পশ্চিম তীরের নিষেধাজ্ঞা থেকে কূটনৈতিক যুদ্ধ, ইসরায়েলকে কঠোর বার্তা ব্রিটেনের

পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট
কূটনীতির দরজা যখন বন্ধ হয়, তার শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যায়। পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের ইসরায়েলি সিদ্ধান্ত ঘিরে এবার সেই শব্দ পৌঁছেছে লন্ডনেও। ইসরায়েল যদি কনস্যুলেটটি বন্ধ করে সেখানে কর্মরত ২৭ ব্রিটিশ কূটনীতিকের মর্যাদা বাতিল করে, তবে পাল্টা ২৭ ইসরায়েলি কূটনীতিককে যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। দুই দেশের সম্পর্কে এমন পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুতর কূটনৈতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েনেট প্রথম এই হুঁশিয়ারির কথা জানায়। তাদের দাবি, ইসরায়েলে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত সাইমন ওয়াল্টার্স দেশটির কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, কনস্যুলেটের ২৭ ব্রিটিশ কূটনীতিকের প্রত্যেকের বিপরীতে একজন করে ইসরায়েলি কূটনীতিককে লন্ডন ছাড়তে বলা হতে পারে। তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। তারা ‘জল্পনা’ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইসরায়েল গত ৮ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটটি ৮ অক্টোবরের মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। এর আগে ব্রিটেন অধিকৃত পশ্চিম তীরের আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে বিবেচিত ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ এবং বসতি নির্মাণে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ব্রিটেনের দাবি, বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’আর ব্রিটিশ সিদ্ধান্তকে “নৈতিকভাবে বিকৃত” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি লেবার সরকারকে ইসরায়েলের প্রতি বৈরী আচরণের অভিযোগও করেছেন। এক ইসরায়েলি কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, দেশটির বিরুদ্ধে নেওয়া যেকোনো পদক্ষেপের “উপযুক্ত জবাব” দেওয়া হবে।
সংকট ঠেকাতে ব্রিটিশ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল গত সপ্তাহে গোপনে ইসরায়েল সফর করেছেন। রয়টার্সের তিনটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার বা স্থগিত করতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। সেই আলোচনা কোনো সমঝোতা আনতে পারেনি। তবে দুই পক্ষের যোগাযোগ এখনও চলছে এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার কনস্যুলেট বন্ধের পরিকল্পনা বহাল রয়েছে।
শেখ জাররাহ এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেটটি তেল আবিবের ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে আলাদা। এটি পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ব্রিটেনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কনস্যুলার সম্পর্ক দেখভাল করে। যুক্তরাজ্যের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, পূর্ব জেরুজালেম ইসরায়েলের দখলকৃত ভূখণ্ড এবং জেরুজালেমের সার্বভৌম মর্যাদা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।
সাবেক ব্রিটিশ অ্যাটর্নি জেনারেল ডমিনিক গ্রিভ অনানুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্র দপ্তরকে জানিয়েছেন, পূর্ব জেরুজালেমের মিশন বন্ধ করতে ইসরায়েলের কর্তৃত্ব দাবি আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন তুলতে পারে। পশ্চিমা কূটনীতিকদেরও আশঙ্কা, এটি জেরুজালেমে অন্য দেশের কূটনৈতিক মিশনের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে।
এই বিরোধ একদিনে তৈরি হয়নি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিলেও পরে বেসামরিক প্রাণহানি ও পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে লন্ডনের সমালোচনা বাড়ে। যুক্তরাজ্য ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানির বহু লাইসেন্স বাতিল করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড গাজায় যুদ্ধাপরাধের প্রমাণের কথা বললেও ‘গণহত্যা’ নির্ধারণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতের বলে জানিয়েছেন।
ইসরায়েল একই ধরনের বসতি-বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার জেরে নেদারল্যান্ডসের ফিলিস্তিনি মিশনে থাকা ডাচ কূটনীতিকদের স্বীকৃতি বাতিলের কথাও জানিয়েছে। তবে একই উদ্যোগে যুক্ত ফ্রান্স ও কানাডার বিরুদ্ধে এখনও তেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এখন সব নজর ৮ অক্টোবরের দিকে। কনস্যুলেট সত্যিই বন্ধ হলে লন্ডন পাল্টা ২৭ কূটনীতিক বহিষ্কারের পথে হাঁটবে কি না, সেটিই ঠিক করবে ব্রিটেন-ইসরায়েল সম্পর্ক আরও গভীর সংকটে নামবে, নাকি শেষ মুহূর্তের কূটনীতি বন্ধ দরজাটি আবার খুলতে পারবে।



