ইরান যুদ্ধের অভিঘাতে চাপে ব্রিটিশ অর্থনীতি, কঠিন পরীক্ষার মুখে বার্নহ্যাম সরকার

সংগৃহীত ছবি
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ এবং তার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে চলেছে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে। বুধবার (২৯ জুলাই) দেশটির শীর্ষ অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ (এনআইইএসআর) প্রকাশিত সর্বশেষ অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের জেরে তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারকে আসন্ন শরৎকালীন বাজেটে "খুবই কঠিন সমঝোতা" করতে হতে পারে। অর্থাৎ নতুন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গেলে কর বৃদ্ধি, ব্যয় সংকোচন অথবা অন্য খাতে বরাদ্দ কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
এনআইইএসআরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ মার্কিন ডলারের ওপরে ওঠায় যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়ছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে দেশটির মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রায় তা নামতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে সরকারের ব্যয়ের প্রকৃত মূল্য দ্রুত কমে যায়। ফলে বর্তমান পরিকল্পনা অপরিবর্তিত থাকলে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে সরকারি সেবা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রকৃত ব্যয় ধরে রাখতে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ বিলিয়ন পাউন্ড প্রয়োজন হবে। এই অর্থের ব্যবস্থা না করলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক সেবার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির পরিচালক ডেভিড আইকম্যান বলেছেন, "সরকারের সামনে খুবই কঠিন কিছু সমঝোতা রয়েছে। নতুন অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে করব্যবস্থায় পরিবর্তন, ব্যয় সাশ্রয় অথবা অন্য উৎস থেকে অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।" তাঁর মতে, সমস্যা আরও বড় হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্কার শুরু করা সরকারের জন্য বেশি কার্যকর হবে।
এনআইইএসআরের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাবে আগামী দুই বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে প্রায় ২৮ বিলিয়ন পাউন্ড হারিয়ে যেতে পারে। যদিও ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে, তবুও বছরের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থনীতির গতি মন্থর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম ইতিমধ্যেই জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার আদলে প্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এসব কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এনআইইএসআর স্পষ্ট জানিয়েছে, অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে কর সংস্কার ও ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অর্থের ব্যবস্থা করাই বেশি টেকসই পথ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়, এর অভিঘাত এখন ইউরোপের অর্থনীতিতেও স্পষ্ট। তেলের উচ্চমূল্য জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন বেড়ে চলেছে, তেমনি সরকারের আর্থিক পরিকল্পনাও নতুন করে চাপে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে শরৎকালীন বাজেটই হবে বার্নহ্যাম সরকারের প্রথম বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা।






