পুরনো মুখ, নতুন সমীকরণ!
চমক রেখে মন্ত্রিসভা সাজালেন বার্নহ্যাম

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ঘোষিত মন্ত্রীসভার সদস্যরা। ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নেওয়ার পরই তার প্রথম মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেছেন। অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের ওপর আস্থা রেখে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন তিনি। সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে মিল রেখে নতুন দায়িত্ব বণ্টন করেছেন বার্নহ্যাম।
নতুন মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে আলোচিত নিয়োগ হয়েছে জন হিলিকে অর্থমন্ত্রী (চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার) করা। স্টারমার সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি। গত মাসে প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার অভিযোগ তুলে স্টারমারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন৷ তবে টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকারের সময়ে তিনি ট্রেজারিতে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রী ও আর্থিক সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। অর্থনীতি পরিচালনা, বাজেট প্রণয়ন এবং সরকারি ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার বড় দায়িত্ব এখন তাঁর হাতে দিয়েছেন বার্নহ্যাম।
এড মিলিব্যান্ড পেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। তিনি ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত লেবার পার্টির নেতা ছিলেন। কিয়ার স্টারমারের সরকারে তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু নীতি ও সবুজ অর্থনীতির পক্ষে অবস্থানের জন্য পরিচিত মিলিব্যান্ড এবার যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে শাবানা মাহমুদকে বহাল রেখেছেন বার্নহ্যাম। স্টারমার সরকারের সময় তিনি এই দায়িত্ব পেয়েছিলেন। অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন এনে ইভেট কুপারকে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবামন্ত্রী করা হয়েছে। স্টারমার সরকারের শেষ দিকে কুপার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কুপারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) সংকট মোকাবিলা করা।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ওয়েস স্ট্রিটিং। এর আগে তিনি স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবামন্ত্রী ছিলেন। এনএইচএস সংস্কারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকা স্ট্রিটিংকে এবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন বার্নহ্যাম। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা নীতি, সামরিক ব্যয় এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে তাঁর বড় দায়িত্ব।
আবাসন সংকট মোকাবিলায় আবারও দায়িত্বে ফিরেছেন অ্যাঞ্জেলা রেইনার। তিনি স্টারমার সরকারের শুরুতে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং আবাসন ও স্থানীয় সরকারবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। যুক্তরাজ্যে নতুন বাড়ি নির্মাণ, কাউন্সিল হাউস বাড়ানো এবং আবাসন ব্যয় কমানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বার্নহ্যাম। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রেইনারের ওপর দিয়েছেন তিনি।
শিল্প ও ব্যবসা খাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন জোনাথন রেনল্ডস। স্টারমার সরকারের শুরুতে তিনি ব্যবসা ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। নতুন সরকারে ব্যবসা, উদ্ভাবন, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিষয়ক দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং নতুন প্রযুক্তি খাতে উন্নয়ন তাঁর প্রধান দায়িত্ব হবে।
লুইস হেইকে করা হয়েছে ফার্স্ট সেক্রেটারি অব স্টেট এবং চ্যান্সেলর অব দ্য ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টার। তিনি আগে স্টারমার সরকারের পরিবহনমন্ত্রী ছিলেন। বার্নহ্যামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সরকারের নীতি সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী করা হয়েছে লুসি পাওয়েলকে। অন্যদিকে ব্রিজেট ফিলিপসন, যিনি স্টারমার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তাঁকে নারী ও সমতা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে লিসা ন্যান্ডিকে বহাল রাখা হয়েছে। কর্মসংস্থান ও পেনশন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন প্যাট ম্যাকফ্যাডেন। একই সঙ্গে অ্যানেলিস মিডগলিকে নতুন চিফ হুইপ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও নেট-জিরো বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন মিয়াটা ফানবুলেহ। এর আগে তিনি জ্বালানি ও জলবায়ু নীতির সঙ্গে যুক্ত কনিষ্ঠ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সবুজ শিল্প এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি কাজ করবেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ডেম অ্যাঞ্জেলা ইগল। বিচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অ্যালেক্স নরিসকে। পরিবহন মন্ত্রণালয়ে বহাল রয়েছেন হেইডি আলেকজান্ডার।
আইন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এসেছেন এলি রিভস। তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভসের বোন। নতুন সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এমা রেনল্ডসকে করা হয়েছে ট্রেজারির চিফ সেক্রেটারি। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন হ্যামিশ ফ্যালকনার। ইইউ সম্পর্কবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে তিনি চলতি বছরের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন সমঝোতা বা ‘রিসেট ডিল’ নিয়ে আলোচনায় ব্রিটিশ সরকারের হয়ে কাজ করবেন।
প্রযুক্তি খাতেও নতুন মুখ এনেছেন বার্নহ্যাম। কানিশকা নারায়ণকে এআই মন্ত্রী করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং সরকারি পরিষেবায় এআই ব্যবহারের নীতি তৈরিতে তিনি কাজ করবেন।
আঞ্চলিক মন্ত্রণালয়গুলোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্টিফেন কিনক হয়েছেন ওয়েলস বিষয়ক মন্ত্রী। স্যার ক্রিস ব্রায়ান্ট পেয়েছেন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব। অন্যদিকে ডগলাস আলেকজান্ডার স্কটল্যান্ড বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।
তবে বার্নহ্যামের নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা হয়নি স্টারমারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার। সাবেক অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি এবং সাবেক কর্মসংস্থান ও বিজ্ঞানমন্ত্রী লিজ কেন্ডাল নতুন মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ভাষণে বার্নহ্যাম বলেছেন, তার সরকার মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেবে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, গৃহহীনতা দূর করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা তার সরকারের প্রধান লক্ষ্য হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বার্নহ্যামের প্রথম মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। স্টারমার সরকারের পরিচিত মুখদের কয়েকজনকে রেখে তিনি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন, আবার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জায়গায় নিজের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলনও ঘটিয়েছেন। এখন বড় পরীক্ষা হবে, এই দল নিয়ে তিনি ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সংকট ও জনআস্থার ঘাটতি কতটা কাটিয়ে উঠতে পারেন।




