ঝাঁ-চকচকে লন্ডনের ফুটপাত এক অন্ধকার জীবন
- তাঁবুর সারি; ভিক্ষা আর চুরি নিত্যদিনের ঘটনা

ছবি: রয়টার্স
কয়েক পা দূরেই অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আলোঝলমলে দোকান। পাশে দামি হোটেল, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট আর পর্যটকের ভিড়। অথচ সেই একই এলাকার ফুটপাতে সারি সারি তাঁবু। কোথাও কম্বল পেতে রাত কাটছে, কোথাও ঠেলাগাড়িতে জমা সংসারের সামান্য জিনিসপত্র। প্রকাশ্যে কাপড় ধোয়া কিংবা রাস্তাতেই গোসলের দৃশ্যও চোখে পড়ছে৷
লন্ডনের অন্যতম অভিজাত ও ব্যস্ত এলাকা মার্বেল আর্চ, পার্ক লেন এবং অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আশপাশে পথবাসীদের এই উপস্থিতি এখন নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্র। স্থানীয় দোকানদার, হোটেলকর্মী ও বাসিন্দাদের একাংশ বলছেন, শুধু তাঁবু নয়, ভিক্ষাবৃত্তি, প্রকাশ্যে মাদক গ্রহণ, মাতলামি, আবর্জনা এবং দোকানচুরির ঘটনাও তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
ওই শিবিরে থাকা মানুষের একটি অংশ রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া থেকে আসা। কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ীর অভিযোগ, পরিচিত কয়েকটি মুখ প্রতিদিন আশপাশের দোকান ও পর্যটন এলাকায় ঘোরাফেরা করে এবং তাঁদের কেউ কেউ চুরি বা আগ্রাসী ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত।
তবে এই অভিযোগগুলোর প্রতিটি পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত, এমন তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে গোটা শিবির বা কোনো জাতীয়তার মানুষের আচরণ হিসেবে দেখার সুযোগও নেই।
এলাকার ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই ব্যক্তিদের তাঁরা মার্বেল আর্চ ও অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আশপাশে দেখতে পাচ্ছেন। কেউ দোকানের সামনে ভিক্ষা করছেন, কেউ পর্যটকদের কাছে অর্থ চাইছেন।
আরও গুরুতর অভিযোগ দোকানচুরি নিয়ে। স্থানীয় কয়েকজন দোকানকর্মীর দাবি, ছোটখাটো চুরি এত নিয়মিত হয়ে উঠেছে যে অনেক ক্ষেত্রেই আর প্রতিটি ঘটনা পুলিশে জানানো হয় না। আশপাশের ব্যবসায় ক্ষতির পাশাপাশি কর্মীদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
তবে এই নির্দিষ্ট শিবিরের বাসিন্দাদের সঙ্গে কতটি নথিভুক্ত দোকানচুরির মামলা সরাসরি যুক্ত, সে বিষয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
সমস্যাটি হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০২৫ সালেও পার্ক লেন এলাকায় বড় একটি পথবাসী শিবির সরানোর পর তাঁদের একটি অংশ অক্সফোর্ড স্ট্রিটের দিকে চলে গিয়েছিলেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল। সেই সময় জন লুইস ও মার্কস অ্যান্ড স্পেনসারের মতো বড় দোকানের বাইরে লম্বা সারিতে মানুষকে কম্বল ও স্লিপিং ব্যাগে রাত কাটাতে দেখা যায়। স্থানীয় কাউন্সিল তখন জানিয়েছিল, তাদের পথবাসী সহায়তাকারী দল এসব মানুষের সঙ্গে কথা বলছে এবং হোস্টেলে থাকার সুযোগ, মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার পথ দেখাচ্ছে।
অর্থাৎ, শুধু একটি জায়গা থেকে শিবির তুলে দিলেই সমস্যার শেষ হচ্ছে না। মানুষ এক ফুটপাত থেকে আরেক ফুটপাতে চলে যাচ্ছেন, আর সেই সঙ্গে বিরোধও স্থানান্তরিত হচ্ছে।
কাউন্সিলও বলছে, সমস্যা গুরুতর
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ক্ষোভের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে মিল রয়েছে ওয়েস্টমিনস্টার সিটি কাউন্সিলের উদ্বেগেরও।
গত ১৫ জুলাই লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের কাছে পাঠানো চিঠিতে ওয়েস্টমিনস্টার কাউন্সিল সরাসরি পথবাসী, তাঁবু, রাস্তায় অসামাজিক আচরণ এবং সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় আরও শক্ত পদক্ষেপ চেয়েছে। একই সঙ্গে মেট্রোপলিটন পুলিশ ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর দাবিও করেছে তারা।
কাউন্সিলের বক্তব্য, ওয়েস্টমিনস্টার সাধারণ একটি আবাসিক এলাকা নয়। ব্রিটেনের রাজপ্রাসাদ, সরকারি ভবন, দূতাবাস, বড় পর্যটনকেন্দ্র, কেনাকাটার এলাকা ও রাতের অর্থনীতি–সব মিলিয়ে এখানে পুলিশের উপর চাপ অন্য অনেক এলাকার তুলনায় বেশি।
লন্ডনজুড়েই রেকর্ড গৃহহীনতা
মার্বেল আর্চের তাঁবুগুলোকে শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলেও পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না। লন্ডন অ্যাসেম্বলি জানিয়েছে, রাজধানীতে রাস্তায় রাত কাটানো মানুষের সংখ্যা এখন রেকর্ড পর্যায়ে। ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ৬৩ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০২১-২২ সালের পর থেকে প্রতি বছরই ঊর্ধ্বমুখী। আবাসনব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অর্থাভাব, সহায়তাকেন্দ্রে জায়গার ঘাটতি এবং অনেক পথবাসীর জটিল শারীরিক ও মানসিক সমস্যাকে পরিস্থিতির বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
লন্ডনের সরকারি ‘চেইন’ তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর–এই তিন মাসেই ৪ হাজার ৮৪১ জনকে রাজধানীর রাস্তায় ঘুমাতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৫০ জন ওই সময় প্রথমবারের মতো রাস্তায় ঘুমিয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মোট সংখ্যা বেড়েছিল ৫ শতাংশ।
পরের প্রান্তিকে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ-এ ৩ হাজার ৯৪৪ জনকে রাস্তায় ঘুমাতে দেখা যায়। আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা কিছুটা কমলেও গৃহহীনতার দীর্ঘমেয়াদি চাপ এখনও অত্যন্ত বেশি।
তবে স্থানীয় ক্ষোভের বিপরীতে পথবাসীদের বক্তব্যও অন্য বাস্তবতার কথা বলে। লন্ডনের একটি তাঁবুশিবিরে বসবাসকারী এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিনি দুই-তিন বছর ধরে রাস্তায় আছেন এবং তাঁবুর বাসিন্দারা পরস্পরকে সাহায্য করেই টিকে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গ্রীষ্ম তুলনামূলক সহজ হলেও শীত তাঁদের জন্য ভয়াবহ কঠিন। ওই শিবিরের বাসিন্দাদের বড় অংশ রোমানিয়ান বলে তিনি দাবি করেন।
দোকানদারের কাছে তাঁবু মানে ক্রেতা কমে যাওয়া, দুর্গন্ধ বা নিরাপত্তার ভয়। পর্যটকের কাছে সেটি অস্বস্তির ছবি। অথচ তাঁবুতে থাকা মানুষের কাছে সেটিই হয়তো রাতের একমাত্র আশ্রয়।
পুরোনো সমস্যার নতুন রূপ
মার্বেল আর্চ এলাকায় রোমানিয়ান পথবাসী বা ভিক্ষুকদের উপস্থিতি নিয়েও বিতর্ক নতুন নয়। ২০১২ ও ২০১৩ সালেও একই এলাকায় রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া থেকে আসা মানুষের তাঁবু বসানো ও ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। তখনও কাউন্সিল ও পুলিশ বারবার তা সরানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পর সেই একই এলাকার ফুটপাতে আবারও তাঁবুর সারি দেখা যাচ্ছে। ফারাক শুধু এটুকুই, এখন লন্ডনজুড়ে গৃহহীনতার সংখ্যাও অনেক বেশি, আবাসনের ব্যয় আরও চড়া এবং প্রশাসনের উপর চাপও বহুগুণ।
ঝলমলে শহরের পাশেই অন্য বাস্তবতা
এই বিতর্কের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দিক সম্ভবত জায়গাটিই৷ অক্সফোর্ড স্ট্রিটকে আরও আকর্ষণীয়, আধুনিক ও পর্যটকবান্ধব করে তুলতে বড় পরিকল্পনা চলছে। অথচ সেই কেনাকাটার স্বর্গের কয়েক পা দূরেই মানুষ ফুটপাতে ঘুমাচ্ছেন।
ফলে লন্ডনের সামনে এখন দুটি আলাদা প্রশ্ন। একটি–চুরি, ভিক্ষাবৃত্তি বা অসামাজিক আচরণ হলে আইন কত দ্রুত প্রয়োগ করা হচ্ছে? আর দ্বিতীয়টি আরও কঠিন–এক জায়গা থেকে তাঁবু সরিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান, যদি সেই মানুষটিই পরের রাতে আরেকটি ফুটপাতে গিয়ে ঘুমায়?
মার্বেল আর্চের ঝলমলে আলো আর তার নিচে সারি সারি তাঁবু তাই একই শহরের দুই বিপরীত ছবি। একদিকে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাজধানীর চাকচিক্য, অন্যদিকে সেই রাজধানীর ফুটপাতেই মাথা গোঁজার জায়গা খুঁজে বেড়ানো মানুষ।





