ব্রিটেনের ইসরায়েলনীতির মোড় ঘোরানোর নেপথ্যে মেলানিয়া
- পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে নতুন সুর
- লন্ডনের অবস্থান বদলের নেপথ্যে কূটনৈতিক চাপ ও ব্যক্তিগত বার্তার ইঙ্গিত

মেলানিয়া ট্রাম্প
দীর্ঘদিনের মিত্র। কিন্তু সেই মিত্রতার মধ্যেই এবার দূরত্বের রেখা স্পষ্ট। ইসরায়েল প্রশ্নে ব্রিটেনের অবস্থানে যে বড় পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, ছিল নানা স্তরের কূটনৈতিক যোগাযোগও। এমনই দাবি উঠে এসেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইনিউজের শুক্রবারের (১১ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের নীতির পরিবর্তনের নেপথ্যে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও আলোচনায় এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন ইসরায়েলের অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করেছে, অবৈধ ওইসব বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে এবং বসতি সম্প্রসারণে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি লন্ডনের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু ব্রিটেনের এই অবস্থান বদল একদিনে হয়নি। আইনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ বাড়ছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের নীতির বিষয়ে ভিন্ন ধরনের আলোচনা তৈরি হচ্ছিল।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মেলানিয়া ট্রাম্প মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং তাঁর কিছু ব্যক্তিগত বার্তা ওয়াশিংটন ও মিত্র দেশগুলোর আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে। যদিও এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
ব্রিটেনের এই নীতি পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতি। লন্ডনের বক্তব্য, এই বসতি সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে। এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, ব্রিটেনকে “আন্তর্জাতিক আইন এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে”।
এই সিদ্ধান্ত অবশ্য ইসরায়েল কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তেল আবিবের অভিযোগ, ব্রিটেন একতরফাভাবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েল ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় এবং কয়েকজন ব্রিটিশ রাজনীতিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও ছিল সতর্ক। যদিও ওয়াশিংটন সরাসরি ব্রিটেনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করেনি, মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে এই ধরনের সিদ্ধান্ত ইসরায়েল-ব্রিটেন সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনের এই অবস্থান পরিবর্তন শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে নীতিগত পরিবর্তন নয়; এটি পশ্চিমা বিশ্বের ভেতরে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বদলে যাওয়া মনোভাবেরও ইঙ্গিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ব্রিটেন এখন মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাস্তব প্রয়োগে। নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে, ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা কীভাবে চলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে যাবে–সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
কারণ ইসরায়েল প্রশ্নে ব্রিটেনের এই নতুন পথ শুধু লন্ডন-তেল আবিব সম্পর্কের পরিবর্তন নয়, বরং পশ্চিমা কূটনীতির বড় এক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও দিচ্ছে।



