আয়ারল্যান্ডের শক্তিশালী অর্থনীতিতেও মাস চালাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সত্ত্বেও দেশটির সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট
ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ আয়ারল্যান্ড। বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানির বিনিয়োগ, শক্তিশালী শ্রমবাজার, উচ্চ মাথাপিছু আয় এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়নের একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে দেশটির সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে পড়েছেন। আবাসন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এখন আয়ারল্যান্ডের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার আগের তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও মানুষের দৈনন্দিন খরচ কমেনি। বরং যে খাতগুলোতে পরিবারের সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়, সেসব ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার আগের তুলনায় বেশি আয় করেও আর্থিক স্বস্তি পাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, আয়ারল্যান্ড বর্তমানে এমন একটি বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে সামষ্টিক অর্থনীতি শক্তিশালী থাকলেও ব্যক্তিগত অর্থনীতি ক্রমশ চাপে পড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে আবাসন সংকটকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। গত এক দশকে বাড়ির দাম এবং বাড়িভাড়া ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ডাবলিন, কর্ক, গ্যালওয়ে এবং লিমেরিকের মতো প্রধান শহরগুলোতে ভাড়ার হার নতুন রেকর্ড গড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ডাবলিনে একটি সাধারণ দুই শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে মাসে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ ইউরো পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মজীবী মানুষের আয়ের অর্ধেকেরও বেশি অংশ শুধু আবাসন ব্যয়ের পেছনে চলে যাচ্ছে। ফলে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজস্ব বাসস্থানের স্বপ্ন আরও দূরে সরে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসন সংকটের মূল কারণ হলো চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অভিবাসনের হার বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় নতুন বাড়ি নির্মাণ হচ্ছে না। নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, পরিকল্পনা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাজারে পর্যাপ্ত আবাসন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে বাড়িভাড়া এবং সম্পত্তির মূল্য উভয়ই উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। আবাসনের পর মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে জ্বালানি ব্যয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর কাঠামোর পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ছে। বিশেষ করে শীতকালে গৃহস্থালি গরম রাখার জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে অনেক পরিবারকে বাড়তি আর্থিক চাপ বহন করতে হয়। একই সঙ্গে পেট্রোল ও ডিজেলের মূল্যও উচ্চ পর্যায়ে থাকায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যা পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে।
এদিকে শ্রমবাজার শক্তিশালী থাকায় আয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে গড় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে। তবে বেতন বৃদ্ধির সুফল অনেকাংশেই মূল্যস্ফীতির কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষের নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা একই হারে বাড়ছে না। ফলে বেতন বৃদ্ধি সত্ত্বেও অনেক পরিবার আগের মতো জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে সংগ্রাম করছে।
শিক্ষা খাতেও ব্যয় বৃদ্ধি লক্ষণীয়। শিশুদের ডে-কেয়ার, স্কুল-সংক্রান্ত খরচ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা এবং বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যয় পরিবারগুলোর জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বীমা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য পরিষেবার খরচ বৃদ্ধিও জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে একাধিক সন্তান রয়েছে, তাদের জন্য মাসিক বাজেট সামলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী, নতুন অভিবাসী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। প্রতিবছর হাজার হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য আয়ারল্যান্ডে আসেন। একইভাবে দক্ষ কর্মী এবং অভিবাসীর সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু উচ্চ ভাড়া এবং সীমিত আবাসন সরবরাহের কারণে নতুনদের জন্য স্থায়ী বাসস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থীকে অস্থায়ী আবাসনে থাকতে হচ্ছে অথবা শহরের বাইরে বসবাস করতে হচ্ছে, যার ফলে যাতায়াত ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। উচ্চ আয় থাকা সত্ত্বেও আবাসন ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো কিছু সরকারি সহায়তা পেলেও মধ্যম আয়ের অনেক পরিবার সেই সুবিধার আওতার বাইরে। অথচ তাদেরকেই একদিকে বাড়িভাড়া বা মর্টগেজ, অন্যদিকে ডে-কেয়ার, শিক্ষা, পরিবহন এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার এখন সঞ্চয় কমিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নতুন আবাসন নির্মাণ, সামাজিক আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ, জ্বালানি সহায়তা কর্মসূচি এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন, সমস্যার মূল উৎস আবাসন সংকটের কার্যকর সমাধান না হলে অন্যান্য পদক্ষেপের প্রভাব সীমিত থাকবে। বাজারে পর্যাপ্ত আবাসন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বাড়িভাড়া এবং সম্পত্তির মূল্য উচ্চ পর্যায়েই থেকে যাবে। সামনের বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার সম্ভাবনা থাকলেও আবাসন ও জ্বালানি খাতের চাপ দ্রুত কমবে বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আয়ারল্যান্ডকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে, কিন্তু একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে যাবে।
অর্থনীতি বাড়ছে, বিনিয়োগ বাড়ছে, কর্মসংস্থানও বাড়ছে তবু সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ কেন আর্থিক স্বস্তি পাচ্ছে না, সেই প্রশ্ন এখন আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট তাই আর কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয় এটি এখন লাখো মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা, যা আগামী বছরগুলোতে দেশটির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।







