তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় ইউরোপ কেন অপ্রস্তুত

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে প্রচণ্ড তাপে নিজেদের ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছেন দুজন- সংগৃহীত
তাপপ্রবাহের তীব্রতায় পুড়ছে ইউরোপ। কয়েক দশকের জলবায়ু সতর্কতার পরেও অঞ্চলটি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ। একে অনিবার্য করুণ পরিণতি হিসেবে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত বুধবার পিয়ের মাসেলট তার মেয়ের নার্সারি স্কুল থেকে একটি খুদে বার্তা পান। জুন মাসে যুক্তরাজ্যের রেকর্ড তাপমাত্রার প্রথম সাক্ষী হওয়া আবহাওয়া স্টেশন থেকে স্কুলটির দূরত্ব ৫০ মাইলের কম। বার্তায় অভিভাবকদের বলা হয়, ক্লাসরুমগুলো চরম মাত্রায় গরম হয়ে গেছে। অভিভাবকরা যেন দ্রুত তাদের সন্তানদের বাড়ি নিয়ে যান।
চলতি সপ্তাহে পুরো ইউরোপজুড়েই এমন দৃশ্য লক্ষ্য করা গেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র ও বিস্তৃত তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে পুড়ছে পুরো মহাদেশ। কার্বন দূষণের কারণে এই তাপপ্রবাহ আরও ভয়ানক হয়ে উঠেছে। অপরদিকে জলবায়ু মোকাবিলায় বারবার ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি মানুষের সহ্যের বাইরে চলে গেছে। ফ্রান্স তাদের ইতিহাসের উষ্ণতম দিন ও রাত পার করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য এবং সুইজারল্যান্ড—উভয় দেশই জুনের গরমের আগের রেকর্ড ভেঙেছে।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের পরিবেশগত মহামারি বিশেষজ্ঞ পিয়ের মাসেলট। ইউরোপে তাপপ্রবাহের কারণে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা খুঁজে বের করার অন্যতম প্রধান গবেষক তিনি। গত কয়েকটা দিন তার কাছে মনে হয়ে ২০০৩ সালের ইউরোপের সেই ভয়াবহ গ্রীষ্মের মতো। তখন নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে ভয় পাওয়ার বয়সে তিনি ছিলেন না। কিন্তু সেই চরম দাবদাহের ভয়াবহতা বোঝার সক্ষমতা ছিল।
তখন দক্ষিণ ফ্রান্সের এক কিশোর (মাসেলট) গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে রোদের মধ্যে বাস্কেটবল খেলছিল। আর ঠিক তখনই আগস্টের তীব্র গরমে ইউরোপের শহরগুলো যেন এক একটি চুল্লিতে পরিণত হয়েছিল। প্রচণ্ড গরমে দিনগুলো ছিল বিষন্ন। প্রচণ্ড তাপের কারণে রাতের ঘুম ছিল না বাসিন্দাদের। সে বছর তীব্র তাপে প্রাণ হারান ৭০ হাজার। বেশিরভাগই ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। বিশেষ করে একা বসবাসকারী নারীরা।
অতীতের সেই পরিস্থিতিই যেন আজকের ইউরোপের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। আজকে যা ব্যতিক্রম, তাই আগামী দিনের স্বাভাবিক রূপ নেবে। মাসেলটের ছোট সন্তানটির বয়স যখন ১৪ বছর হবে (২০০৩ সালে মাসেলটের বয়স যা ছিল), ততদিনে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (২.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট) সীমা ছাড়িয়ে যাবে। অথচ এটি চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিশ্বনেতারা। তখন এই চরম আবহাওয়ার নির্মম আঘাত পৌঁছে যাবে অনন্য উচ্চতায়।
বর্তমানে ৩৭ বছর বয়সী মাসেলট বললেন, ‘জলবায়ু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন আমাদের সামনে ২০০৩ সালের মতো আরও অনেক বছর আসবে। এখন এটি অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে সেটাই সত্যি হচ্ছে।’
বারবার সতর্কতা ও সচেতনতা সত্ত্বেও তাপপ্রবাহের কারণে মহাদেশটির বড় একটি অংশ একেবারে কাবু হয়ে যায়। গরমের কারণে ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল জরুরি অবস্থা (ক্রিটিকাল ইনসিডেন্ট) ঘোষণা করেছে। সেখানে কুলিং ইউনিটগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ আইটি সিস্টেমগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও রেলপথের সময়সূচিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সে, যেখানে অর্ধেক বাড়িরই তীব্র গরম ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই, সেখানে শরীর ঠান্ডা করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছেন ৫৫ জনের বেশি। তপ্ত গাড়ির ভেতর আটকে মারা গেছে চার শিশু। শীতলীকরণ পানির অভাবে দুটি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে ইউরোপ কি তবে অতীত থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি? ২০০৩ সালের গ্রীষ্মের সেই ধ্বংসযজ্ঞের পর মূলত তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রথম গুরুতর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছিল। তখন সরকারগুলো তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করে। এর মধ্যে সীমিত যাতায়াত, স্কুল বন্ধ রাখা এবং হাসপাতালের সাধারণ অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো বাতিল করার মতো পদক্ষেপ ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের অভিযোজন ব্যবস্থা বেশ সফল হয়েছে। এর ফলে তাপমাত্রার ওঠানামার সঙ্গে মৃত্যুর হার অনেকটাই কমে এসেছে। গত নভেম্বরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৩ সালের মতো একই তীব্রতার তাপপ্রবাহ যদি আজ আঘাত হানে, তবে মৃত্যুর সংখ্যা আগের চেয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ কম হবে।
কিন্তু একই সঙ্গে তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। বায়ুমণ্ডলে গ্রহ-উত্তপ্তকারী দূষণের পরিমাণ যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই প্রচেষ্টা আদৌ টিকবে কি না তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। চলতি বছর গ্রীষ্ম শুরু হওয়ার আগেই মে মাসের তীব্র গরম উত্তর-পশ্চিম ইউরোপকে গ্রাস করে। যুক্তরাজ্যের মে মাসের ঐতিহাসিক তাপমাত্রা এক ধাক্কায় পুরো ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়ে দেয়। এর দুই সপ্তাহ পর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রধান হ্যান্স ক্লুগে বার্লিনে দাঁড়িয়ে সংস্থার তাপ-স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনার নির্দেশিকাটি নতুন রূপ দেওয়ার ঘোষণা দেন। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পেরোতেই বার্লিনের তাপমাত্রা এখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তাপপ্রবাহের কারণে গত চার বছরে ইউরোপে প্রাণ হারিয়েছেন আনুমানিক ২ লাখ মানুষ। এ বিষয়ে ক্লুগে বলছেন, ‘এই ট্র্যাজেডি বা দুঃখজনক ঘটনাটি দ্বিবিধ। প্রথমত, এই মৃত্যুর বেশিরভাগই সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। দ্বিতীয়ত, এটি কেবল দুর্যোগের পূর্বাবাস। কারণ আরও লাখ লাখ মানুষ এর ফলে শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
স্থানীয় আবহাওয়ার ধরণ এবং দ্রুত গলে যাওয়া আর্কটিক অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে অন্য যেকোনো মহাদেশের চেয়ে ইউরোপের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, আজ থেকে মাত্র ৫০ বছর আগেও বছরের এই সময়ে এমন তীব্র গরম পড়া প্রায় অসম্ভবই ছিল।
মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চলতি সপ্তাহে রাতের তাপমাত্রা। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় পেয়েছেন, ২০০৩ সালের তুলনায় রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা এখন প্রায় ১০০ গুণ বেড়েছ। দিনের বেলার তীব্র গরমের আশঙ্কা বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। তবে বিজ্ঞানীরা এই গরমে এল নিনোর কোনো প্রভাব থাকার কথা নাকচ করে দিয়েছেন। এই এল নিনো বছরের শেষের দিকে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ধারণা করা হচ্ছে ২০২৭ সাল হতে পারে বিশ্বের ইতিহাসে উষ্ণতম বছর।






