জ্বালানি বিলের ধাক্কায় ফের চড়ল ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতি
- জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ২.৬ থেকে বেড়ে ২.৯ শতাংশ
- গ্যাসের দাম এক মাসে ১৪.৭ শতাংশ চড়া, অক্টোবরেও বাড়তে পারে জ্বালানি বিল তবে খাবার ও সেবা খাতে কিছুটা স্বস্তি

গ্যাস-বিদ্যুতের বিল বাড়তেই ব্রিটেনে ফের মাথা তুলেছে মূল্যস্ফীতি।
ইরান যুদ্ধের আগুনের আঁচ পৌঁছে গেছে হাজার হাজার মাইল দূরের ব্রিটিশ ঘরেও। গ্যাস-বিদ্যুতের বিল বাড়তেই ফের মাথা তুলেছে মূল্যস্ফীতি। বুধবার প্রকাশিত সরকারি হিসাবে দেখা গেল, জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ২.৯ শতাংশ। জুনে তা ছিল ১৫ মাসের সর্বনিম্ন ২.৬ শতাংশ। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সদ্য ডাউনিং স্ট্রিটে আসা প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে প্রথম বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষাটিও যেন হাজির হলো ঘরের জ্বালানি বিলের হাত ধরেই।
বুধবার সকাল ৭টায় জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করে ব্রিটেনের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস। ২.৯ শতাংশের হার অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিললেও এটি গত চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড অবশ্য গত মাসের পূর্বাভাসে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি ২.৮ শতাংশ হবে বলে ধরেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য এখনও ২ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন হার সেই লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় এক শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে। ব্রিটেনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেম ১ জুলাই থেকে ঘরোয়া জ্বালানির সর্বোচ্চ মূল্যসীমা প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়ায়। এর ফলে সরাসরি ব্যাংক হিসাব থেকে বিল দেওয়া একটি সাধারণ পরিবারের বার্ষিক গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যয়ের মানদণ্ড ১,৬৪১ পাউন্ড থেকে বেড়ে ১,৮৬২ পাউন্ডে দাঁড়ায়, অর্থাৎ বছরে ২২১ পাউন্ড বেশি। শুধু জুলাইয়েই গ্যাসের দাম ১৪.৭ শতাংশ বেড়েছে; এক বছর আগে একই মাসে তা ৭.২ শতাংশ কমেছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর গ্যাসের দামে এটিই সবচেয়ে বড় মাসিক বৃদ্ধিগুলোর একটি।
এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় আন্তর্জাতিক কারণ ইরান যুদ্ধ। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে তেল ও গ্যাসের বিশ্ববাজার অস্থির হয়ে ওঠে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক সমঝোতার পর তেলের দাম কিছুটা কমেছিল, কিন্তু স্থায়ী শান্তির আশা ম্লান হতেই আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বুধবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯১.৬০ ডলার ছিল। গত দুই সপ্তাহেই ব্রেন্টের দাম প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে।
তবে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতির ছবির পুরোটাই খারাপ নয়। জ্বালানির বাইরে অর্থনীতির ভেতরের মূল্যচাপ এখনও তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত। খাদ্য ও অ্যালকোহলবিহীন পানীয়ের বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধি জুনের ১.৭ শতাংশ থেকে কমে জুলাইয়ে ১.৩ শতাংশে নেমেছে, যা প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মাংস, বিশেষ করে গরুর মাংস ও কিছু মুরগির পণ্যের দাম কমেছে; সবজির দামও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি নেমেছে। সুপারমার্কেটগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা জ্বালানি খরচের ধাক্কার একটি অংশ নিজেদের ওপর নেওয়ায় খাবারের দাম আপাতত বেশি বাড়েনি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
সেবা খাতেও কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বিশেষভাবে যে সেবা মূল্যস্ফীতির দিকে নজর রাখে, তা জুনের ৩.৬ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে ৩.৪ শতাংশে নেমেছে। জ্বালানি ও খাদ্যের মতো বেশি ওঠানামা করা পণ্য বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যস্ফীতি বা ‘কোর ইনফ্লেশন’ ২.৬ শতাংশেই স্থির রয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা ২.৫ শতাংশ আশা করেছিলেন।
পরিবহণ খাতও এবারের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে কিছুটা নিচে টেনেছে। জুনে পরিবহণের বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধি ছিল ৫.৭ শতাংশ, জুলাইয়ে তা কমে ৩.৬ শতাংশ হয়েছে। এক মাসে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৮.৮ পেন্স কমে গড়ে ১৬৭.৬ পেন্স এবং পেট্রলের দাম ৩.১ পেন্স কমে ১৫২.২ পেন্স হয়েছে। ইউরোপমুখী বিমানভাড়াও জুলাইয়ে কমেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের দাম আবার বাড়ায় আগস্টের হিসাবে এই স্বস্তি থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
আসবাবপত্র, গৃহস্থালির সামগ্রী এবং পোশাক অবশ্য উল্টো দিকে চাপ দিয়েছে। সাধারণত গ্রীষ্মের ছাড়ে এসব পণ্যের দাম বেশি কমে, কিন্তু এ বছর দোকানগুলো তুলনামূলক কম ছাড় দেওয়ায় দাম গত বছরের মতো কমেনি। ফলে জ্বালানি বিলের পাশাপাশি এগুলোও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে।
এখন বড় প্রশ্ন, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড কি সুদের হার বাড়াবে? গত ২৯ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩.৭৫ শতাংশে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখে। নয় সদস্যের মুদ্রানীতি কমিটির তিনজন তখন ৪ শতাংশে বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ব্যাংকের কেন্দ্রীয় পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছরের শেষ প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩.২ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তবে ইরান যুদ্ধ আরও তীব্র হলে তাদের প্রতিকূল পরিস্থিতির পূর্বাভাসে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি মূল্যস্ফীতি আরও অনেক ওপরে যাওয়ার ঝুঁকিও দেখানো হয়েছে।
বুধবারের তথ্য অবশ্য সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা কিছুটা কমিয়েছে। ইন্টার্যাকটিভ ইনভেস্টরের হিসাবে, চলতি বছরই সুদ বাড়ার বাজারসম্ভাবনা তথ্য প্রকাশের পর ২০ শতাংশের নিচে নেমেছে। কারণ চাকরির বাজার দুর্বল হচ্ছে, বেসরকারি খাতে মজুরি বৃদ্ধিও শ্লথ। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিলের এককালীন ধাক্কা মজুরি ও অন্যান্য পণ্যের দামে ছড়িয়ে স্থায়ী মূল্যস্ফীতিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা আপাতত সীমিত বলে মনে করছেন কয়েকজন অর্থনীতিবিদ।
কিন্তু বার্নহ্যাম সরকারের জন্য রাজনৈতিক অঙ্কটি এত সহজ নয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোকে প্রথম সারির অগ্রাধিকার করেছেন বার্নহ্যাম। অক্টোবর থেকে ঘরের বিদ্যুৎ বিলে মূল্য সংযোজন কর কমিয়ে একটি সাধারণ পরিবারের বছরে প্রায় ৪৫ পাউন্ড সাশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন তাঁর সরকার। বাসভাড়াতেও সহায়তার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জ্বালানির পাইকারি দাম যদি আবার বাড়তে থাকে, সরকারের সেই ছাড় নতুন মূল্যবৃদ্ধিতে প্রায় মুছেও যেতে পারে।
অর্থমন্ত্রী জন হিলিও বুধবার স্বীকার করেছেন, ‘ইরান যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতি’ ব্রিটিশ পরিবারগুলোর ওপর চাপ ফেলছে। তবে তাঁর দাবি, অর্থনীতি এখনও স্থিতিশীল রয়েছে। সমস্যা হলো, অক্টোবরের বাজেটের আগে সরকারের হাতে ব্যয় বাড়ানোর জায়গাও সীমিত। অন্যদিকে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে ১০ বছর মেয়াদি ব্রিটিশ সরকারি বন্ডের সুদ ৫ শতাংশের ওপরে উঠেছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারের ঋণের সুদও বাড়বে, ফলে পরিবারের জন্য নতুন বড় সহায়তা দেওয়া আরও কঠিন হতে পারে।
আর সামনে রয়েছে খাবারের দাম নিয়েও নতুন আশঙ্কা। জুলাই পর্যন্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কম থাকলেও ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহ ও খরায় ফল, সবজি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরবরাহব্যবস্থায় সেই চাপ শরৎ ও শীতের বাজারে পৌঁছলে জ্বালানির সঙ্গে খাবারের দামও নতুন করে বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন খাদ্যশিল্পের প্রতিনিধিরা।
ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জন্য তাই ২.৯ শতাংশ নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। এর অর্থ, শীতের আগে গ্যাস-বিদ্যুতের জন্য আরও বেশি টাকা আলাদা রাখা, বাড়তি বিল মেটাতে অন্য খরচ কমানো, আর সুদ না কমলে বন্ধকী ঋণের চাপও বহন করা।
কয়েক মাস আগে মূল্যস্ফীতি যখন নিচে নামছিল, তখন মনে হয়েছিল দীর্ঘ জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটের শেষটা হয়তো দেখা যাচ্ছে। ১৯ আগস্টের হিসাব সেই স্বস্তির ওপর আবার একটি প্রশ্নচিহ্ন বসাল। ইরানের যুদ্ধক্ষেত্র ব্রিটেন থেকে বহু দূরে, কিন্তু যুদ্ধের দাম এখন আর দূরের নয়, সেটি এসে লেখা হচ্ছে ব্রিটিশ পরিবারের গ্যাস মিটার, বিদ্যুতের বিল আর মাসের শেষে অবশিষ্ট থাকা পাউন্ডের হিসাবে।






