ব্রাজিলে লুলা-বলসোনারোর ভোটের লড়াইয়েও ট্রাম্পের ছায়া

২ অক্টোবর ২০২৬, ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়ায় সাধারণ নির্বাচনের আগে ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) প্রার্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিচ্ছেন তার সমর্থকেরা। ছবি : রয়টার্স
ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট আজ রবিবার। প্রায় ১৬ কোটি ভোটার এ নির্বাচনে অংশ নেবেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভা নির্বাচনও হবে। তবে পুরো নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুজন—বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো।
এই নির্বাচন ব্রাজিলের জন্য শুধু ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়। দেশটি কোন ধরনের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রাজিল কোন অবস্থান নেবে—এসব প্রশ্নও ভোটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
লুলা চান ব্রাজিলকে একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে এগিয়ে নিতে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন, ইউরোপ ও অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার পক্ষে। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং রক্ষণশীল রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
পুরনো দুই রাজনৈতিক শিবির আবার মুখোমুখি
চার বছর আগে লুলা অল্প ব্যবধানে জাইর বলসোনারোকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনের পর ব্রাজিলের রাজনীতি আরও বিভক্ত হয়েছে। জাইর বলসোনারোর সমর্থকেরা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কংগ্রেস, সুপ্রিম কোর্ট ও প্রেসিডেন্ট ভবনে হামলা চালান। পরে জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনের ফল পাল্টাতে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন।
এবার তিনি নিজে প্রার্থী হতে পারেননি। কিন্তু নির্বাচনে তার প্রভাব স্পষ্ট। তার বড় ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোই ডানপন্থী শিবিরের প্রধান প্রার্থী।
ফ্লাভিওর প্রচারে বাবার উপস্থিতিও নানা ভাবে দেখা গেছে। এমনকি তার প্রার্থিতা ঘোষণার অনুষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে তৈরি জাইর বলসোনারোর একটি ভিডিও ব্যবহার করা হয়। ফলে এবারের নির্বাচন অনেকটাই হয়ে উঠেছে ‘লুলা বনাম বলসোনারো’ রাজনীতির আরেক দফা লড়াই।
জাইর বলসোনারো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
জাইর বলসোনারো এখন গৃহবন্দি। আদালতের বিধিনিষেধের কারণে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও সীমিত।
তারপরও ডানপন্থী ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে তিনি এখনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ফ্লাভিও সেই সমর্থন ধরে রাখতে বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে এনেছেন।
ফ্লাভিও ৪৫ বছর বয়সী আইনজীবী। ২০১৯ সাল থেকে তিনি সিনেটর। অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান, অস্ত্র বহনের নিয়ম শিথিল করা এবং কৃষকদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানোর পক্ষে তিনি কথা বলেছেন।
খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রক্ষণশীল ভোটার ও কৃষি খাতের সঙ্গেও তিনি সম্পর্ক বাড়িয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বার্তাও দিয়েছেন।
লুলার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা
৮০ বছর বয়সী লুলা ব্রাজিলের সবচেয়ে পরিচিত বামপন্থী নেতা। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদ প্রেসিডেন্ট থাকার পর ২০২৩ সালে তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরেন।
তার প্রথম দুই মেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে ‘বোলসা ফামিলিয়া’ নামে নগদ সহায়তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে। তার জনপ্রিয়তাও তখন ব্যাপকভাবে বেড়েছিল।
কিন্তু পরে তার দল বড় দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে। লুলা নিজেও দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মামলায় কারাগারে ছিলেন। পরে ২০২১ সালে তার বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল হয়। এর ফলে ২০২২ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ খুলে যায়।
এবার তিনি চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে লুলা আগেই বলেছিলেন, তার তৃতীয় মেয়াদই শেষ মেয়াদ হবে। বয়স ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরও তার দল আবার তাকে প্রার্থী করেছে।
লুলার সামনে অর্থনীতি ও পরিবেশের চাপ
লুলার সমর্থকেরা তার সামাজিক কর্মসূচি ও দারিদ্র্য কমানোর নীতিকে সামনে আনছেন। তার সরকার আমাজনে বন উজাড় কমার কথাও বলছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আমাজনে বন উজাড়ের পরিমাণ গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল বলে স্যাটেলাইট তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে।
তবে পরিবেশ নিয়ে সমালোচনাও আছে। আমাজন নদীর মোহনার কাছে সমুদ্র এলাকায় তেল অনুসন্ধানের অনুমোদন নিয়ে পরিবেশবাদীরা প্রশ্ন তুলেছেন।
লুলার যুক্তি, ব্রাজিলকে ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের অর্থায়নে তেল থেকে পাওয়া রাজস্ব গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ লুলার সামনে একদিকে পরিবেশ রক্ষা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জ্বালানি আয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রশ্ন রয়েছে।
অপরাধের পর দুর্নীতি এখন বড় ইস্যু
নির্বাচনের কয়েক মাস আগেও ব্রাজিলের ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ছিল অপরাধ ও নিরাপত্তা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি সেই আলোচনাকে বদলে দিয়েছে।
এর কেন্দ্রে রয়েছেন ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারো। তিনি ব্যাংকো মাস্টারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ।
ভোরকারোর সঙ্গে ফ্লাভিও বলসোনারোর যোগাযোগের তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। তদন্তকারীরা ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগও খতিয়ে দেখছেন। তিনি কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন।
তবে কেলেঙ্কারিটির প্রভাব শুধু ফ্লাভিওর ওপর পড়েনি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েসের সঙ্গে ভোরকারোর যোগাযোগের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। মোরায়েস কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন।
এখানেই বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আরও জটিল হয়েছে। মোরায়েস ছিলেন জাইর বলসোনারোর মামলার বিচারক। ফলে ডানপন্থী শিবির আগে থেকেই তার সমালোচনা করে আসছে।
ফ্লাভিও এই ইস্যুকে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করছেন। তার বক্তব্য, লুলাকে ভোট দেওয়া মানে মোরায়েসকেও সমর্থন করা।
ভোটারদের সামনে আসল প্রশ্ন কী
ব্রাজিলের ভোটারদের একটি অংশের কাছে এবারের নির্বাচন তাই শুধু লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে পছন্দের বিষয় নয়, বরং তারা কোন ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশ চান, সেটিও বড় প্রশ্ন।
লুলা বামপন্থী সামাজিক নীতি, বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি এবং ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক স্বাধীন অবস্থানের কথা বলছেন। ফ্লাভিও বলসোনারো অপরাধ দমন, রক্ষণশীল সামাজিক মূল্যবোধ, বাজারবান্ধব নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলছেন।
দুই পক্ষের বিভাজন শুধু ব্রাজিলের ভেতরের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন পররাষ্ট্রনীতিতেও দেখা যাচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে লুলার সম্পর্ক গত কয়েক বছরে টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। লুলা বলেছেন, ব্রাজিল কোনো দেশের ‘পেছনের উঠান’ নয়।
অন্যদিকে ফ্লাভিও ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন। নির্বাচিত হলে ট্রাম্প প্রশাসনের নেতৃত্বে গঠিত অপরাধবিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
ট্রাম্পের ছায়াও নির্বাচনে
ফলে ব্রাজিলের নির্বাচন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গেও যুক্ত। এই অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ডানপন্থী ও রক্ষণশীল রাজনীতির প্রভাব বেড়েছে। ব্রাজিলের ফল সেই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করতে পারে।
তবে এটিকে শুধু বাম বনাম ডান লড়াই হিসেবে দেখলে নির্বাচনের পুরো চিত্র ধরা পড়বে না। অপরাধ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম দফায় কি ফল হবে
প্রথম দফায় ১২ জন প্রার্থী প্রেসিডেন্ট পদে লড়ছেন। কিন্তু জনমত জরিপে মূলত লুলা ও ফ্লাভিওই দুই অঙ্কের সমর্থন পেয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ের জরিপগুলোতে লুলা সামান্য এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান কম। শনিবার প্রকাশিত কয়েকটি জরিপও প্রতিযোগিতাকে ঘনিষ্ঠ দেখিয়েছে। কোনো প্রার্থী প্রথম দফায় বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোট হবে।
সাম্প্রতিক সময়ের জরিপগুলোতে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে দ্বিতীয় দফার লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে জরিপগুলো ইঙ্গিত করছে। তবে জরিপ আর ভোটের ফল এক নয়। শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, অনিশ্চিত ভোটার এবং ভোটার উপস্থিতি ফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
কেন এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ
ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশ ও অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনীতি। তাই দেশটির রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ব্রাজিলেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
লুলা জয়ী হলে তার বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা থাকবে। ফ্লাভিও জিতলে বলসোনারো পরিবারের রাজনীতি আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা দেখা যেতে পারে।
কিন্তু ভোটের ফলের আগে সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয় হলো—ব্রাজিল এখনো লুলা-বলসোনারো রাজনৈতিক বিভাজন থেকে বের হতে পারেনি। চার বছর পরও দুই রাজনৈতিক শিবিরের মুখোমুখি অবস্থান তার প্রমাণ।
এবারের ভোট তাই শুধু নতুন প্রেসিডেন্ট বেছে নেওয়ার নির্বাচন নয়। এটি ব্রাজিলের গত এক দশকের রাজনৈতিক মেরুকরণ, দুর্নীতি বিতর্ক, সামাজিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে ভোটারদের আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত।
সূত্র : বিবিসি ও সিএনএন








