ব্রিটিশ নাগরিক না হলে ভাতা বন্ধের প্রস্তাব রিফর্ম ইউকের

রিফর্ম ইউকে দলের নাইজেল ফারাজের দল। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে দীর্ঘদিন বসবাস করলেও ব্রিটিশ নাগরিক না হলে অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় ভাতা বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে নাইজেল ফারাজের দল রিফর্ম ইউকে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ব্রেক্সিটের আগে থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী এবং স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পাওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকেরাও এর আওতায় পড়বেন। তবে তাদের যুক্তরাজ্যে বসবাসের অধিকার বহাল থাকবে।
রিফর্ম ইউকের অর্থবিষয়ক মুখপাত্র রবার্ট জেনরিক সোমবার (১৭ আগস্ট) তুলে ধরেন দলের নতুন কল্যাণনীতি। বিদেশি নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় ভাতা বন্ধের পাশাপাশি অসুস্থতা ও প্রতিবন্ধী ভাতায় বড় ধরনের কাটছাঁট করে বছরে ৫ হাজার কোটি পাউন্ডের বেশি কল্যাণ ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করেছে দলটি। তাদের দাবি, দ্রুত বাড়তে থাকা কল্যাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে করদাতাদের ওপর তৈরি হবে আরও বড় চাপ।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্রিটিশ নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের সার্বজনীন ঋণ, আবাসন ভাতা, পেনশন ঋণ, চাকরিপ্রার্থী ভাতা, শিশু ভাতা, বিনা মূল্যের শিশুযত্ন, বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যের খাবার এবং প্রতিবন্ধী ভাতাসহ প্রায় সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বাদ দেওয়া হবে। তবে যুদ্ধবিধবা পেনশন ও সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষতিপূরণের মতো অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে।
বিদেশি মা-বাবার সন্তান ব্রিটিশ নাগরিক হলে সেই শিশুর জন্য শিশু ভাতা ও বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যের খাবারের মতো কিছু সুবিধা বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। রিফর্ম ইউকের হিসাবে, বিদেশিদের ভাতা বন্ধ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পঞ্চম বছরে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব।
তবে প্রস্তাবটি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের অধিকার নিয়ে। ব্রেক্সিটের পর যেসব ইউরোপীয় নাগরিক স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পেয়েছেন, বর্তমান নিয়মে তারা সাধারণত ব্রিটিশ নাগরিকদের মতো একই শর্তে রাষ্ট্রীয় ভাতা পাওয়ার অধিকার রাখেন। যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় করা প্রত্যাহার চুক্তিতেও তাদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে।
রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে ব্রাসেলসের সঙ্গে ব্রেক্সিট-পরবর্তী চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নতুন করে আলোচনা করতে হতে পারে। এর পাল্টা প্রভাবে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের সমমানের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সমালোচকেরা।
রিফর্ম ইউকে অবশ্য বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা বাতিল করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। অর্থাৎ তারা যুক্তরাজ্যে বসবাসের স্থায়ী অধিকার হারাবেন না। পরিবর্তন হবে রাষ্ট্রীয় ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে। দলটির নীতিবিষয়ক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা বহাল থাকবে। তবে রিফর্ম ইউকে সরকার ক্ষমতায় এলে বিদেশি নাগরিক হিসেবে কল্যাণভাতা পাবেন না তারা।
বর্তমান ব্রিটিশ ব্যবস্থায় অবশ্য সব বিদেশি নাগরিক এমনিতেই ভাতা পাওয়ার অধিকারী নন। অধিকাংশ অস্থায়ী ভিসাধারীর ক্ষেত্রে সরকারি তহবিল থেকে সুবিধা না পাওয়ার শর্ত থাকে। এর ফলে সার্বজনীন ঋণসহ বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় সহায়তা দাবি করতে পারেন না তারা। সাধারণত স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাওয়ার পরই অনেকের জন্য এসব সুবিধার সুযোগ তৈরি হয়। ব্রিটিশ সরকারও জানিয়েছে, বিদেশি আবেদনকারীর অভিবাসন পরিস্থিতি যাচাই করেই দেওয়া হয় ভাতা।
রিফর্ম ইউকের বৃহত্তর পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রতিবন্ধী ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ ব্যক্তিদের ভাতা কমানো। দলটি প্রায় ২ হাজার কোটি পাউন্ড সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে বর্তমান ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভাতা ব্যবস্থা বদলে গুরুতর অসুস্থতা ও মারাত্মক প্রতিবন্ধকতায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য নতুন নগদ সহায়তা চালুর পরিকল্পনা করেছে। অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের সহায়তার দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
এ ছাড়া এক বছরের বেশি সময় ধরে সার্বজনীন ঋণ নিচ্ছেন এবং কাজ করার উপযুক্ত বলে বিবেচিত এমন ব্যক্তিদের সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা সামাজিক কাজে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন জেনরিক। রাস্তা ও শহরকেন্দ্র পরিষ্কার করা, পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রন্থাগার কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মতো দায়িত্ব এর আওতায় থাকতে পারে। এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে থাকবে ভাতা হারানোর ঝুঁকি।
রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি। দলটির বক্তব্য, যুক্তরাজ্যে থাকা অধিকাংশ অভিবাসীর এমনিতেই রাষ্ট্রীয় ভাতায় প্রবেশাধিকার নেই। আর স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পাওয়া ইউরোপীয় নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে ব্রেক্সিট নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন বিরোধ তৈরি হতে পারে। প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মীরাও বলেছেন, ব্যাপকভাবে ভাতা কমানো হলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তবে রবার্ট জেনরিকের যুক্তি, ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থে বিদেশি নাগরিকদের ভাতা দেওয়ার বর্তমান ব্যবস্থা আর চলতে পারে না। তার দাবি, কল্যাণ ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি ঠেকাতে কঠোর পরিবর্তন প্রয়োজন।
ফলে অভিবাসন নিয়ে ব্রিটেনের রাজনৈতিক লড়াই এখন শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বা ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন এমন লাখো মানুষও, যারা বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাস করছেন। রিফর্ম ইউকের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তাদের বসবাসের অধিকার বহাল থাকলেও ব্রিটিশ নাগরিকত্ব না নেওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কল্যাণব্যবস্থার বড় অংশের সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।







