পুতিনকে ‘পরনির্ভর’ বলে খোঁচা জেলেনস্কির
- উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রে ইউক্রেনে রক্তপাত?

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : সংগৃহীত
একা যুদ্ধ চালাতে পারছে না রাশিয়া। উত্তর কোরিয়ার সেনা ও ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়াই টেনে নেওয়া এখন ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে সম্ভব নয়। মস্কোকে এমনই তীব্র খোঁচা দিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার অভিযোগ, ইউক্রেনে নতুন করে চালানো প্রাণঘাতী হামলায় উত্তর কোরিয়ার তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে রাশিয়া। শুধু অস্ত্র নয়, পিয়ংইয়ং থেকে হাজার হাজার সেনা রাশিয়ায় পাঠানোর প্রস্তুতিও চলছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার (১০ আগস্ট) রাত থেকে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নিয়ন্ত্রিত বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত এসেছে জাপোরিঝঝিয়ায়। বিবিসির প্রাথমিক প্রতিবেদনে সেখানে অন্তত ছয়জন নিহত ও ১৯ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরে এপি জানিয়েছে, একটি ইস্পাত কারখানায় হামলায় সাত শ্রমিক নিহত হয়েছেন। দনিপ্রোপেত্রোভস্কেও অন্তত তিনজনের প্রাণ গেছে। ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্টের মঙ্গলবার বিকেলের হিসাবে জাপোরিঝঝিয়া, দনিপ্রোপেত্রোভস্ক ও দোনেৎস্ক মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ১২। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তথ্য আসতে থাকায় হতাহতের সংখ্যা এখনো পরিবর্তন হচ্ছে।
জেলেনস্কির দাবি, জাপোরিঝঝিয়ার হামলায় উত্তর কোরিয়ার সরবরাহ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে রাশিয়া। একই রাতে রাশিয়া জিরকন ক্ষেপণাস্ত্র ও নিয়ন্ত্রিত আকাশ বোমাও ব্যবহার করেছে বলে তার অভিযোগ। কিয়েভেও বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা ঘটে এবং অন্তত একজন আহত হন। তবে জাপোরিঝঝিয়ার ওই হামলায় উত্তর কোরীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি রাশিয়া স্বীকার করেনি। পিয়ংইয়ংও এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, বেসামরিক লক্ষ্য নয়, ইউক্রেনের সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্থাপনাতেই হামলা চালিয়েছে তারা।
মস্কোর দাবি, কিয়েভের পরিবহন ও সরবরাহকেন্দ্রে ড্রোন, রোবোটিক ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধসরঞ্জামের যন্ত্রাংশ রাখা ছিল। জাপোরিঝঝিয়ার জাপোরিঝস্তাল ইস্পাত কারখানাকেও ইউক্রেনের সামরিক শিল্পের জন্য ইস্পাত সরবরাহকারী স্থাপনা হিসেবে বর্ণনা করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য বেসামরিক হতাহতের কথা জানিয়েছে।
রাতের ভাষণে পুতিনকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন জেলেনস্কি। তার বক্তব্য, রাশিয়ার ইতিহাসে এই প্রথম দেশটি উত্তর কোরিয়ার বাড়তি সেনা ছাড়া কোনো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারছে না। জেলেনস্কির দাবি, রাশিয়া ইতিমধ্যে উত্তর কোরিয়া থেকে আরও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে এবং নতুন করে সেনাদের একটি বড় দল নিজের ভূখণ্ডে মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইন্ডিপেনডেন্ট বলছে, মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার পর্যন্ত উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়ায় মোতায়েনের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করছেন জেলেনস্কি। তার ভাষ্য, শুরুতে কয়েক শ, পরে কয়েক হাজার, এবার সেই সংখ্যা অর্ধ লাখে পৌঁছাতে পারে। তবে ৫০ হাজার সেনা পাঠানোর এই সংখ্যা কিয়েভের দাবি। উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়া এখন পর্যন্ত তা নিশ্চিত করেনি।
ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এর আগে জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৯০ সদস্যের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট পশ্চিম রাশিয়ার ভোরোনেঝ অঞ্চলে মোতায়েন হচ্ছে। তাদের সঙ্গে ছয়টি উৎক্ষেপণযন্ত্র ও সর্বোচ্চ ১২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র এরই মধ্যে রাশিয়ায় পৌঁছেছে। এই তথ্যও মূলত ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সূত্রনির্ভর।
উত্তর কোরিয়ার রুশ যুদ্ধে অংশগ্রহণ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সাল থেকে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে পশ্চিমা ও ইউক্রেনীয় সূত্র। ২০২৫ সালে রাশিয়াও প্রথমবার স্বীকার করে, ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে উত্তর কোরীয় সেনারা। মস্কোকে বিপুল পরিমাণ কামানের গোলা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য অস্ত্রও সরবরাহ করেছে পিয়ংইয়ং। দুই দেশের ২০২৪ সালের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে এক পক্ষ আক্রান্ত হলে অন্য পক্ষের সহায়তার অঙ্গীকার রয়েছে।
জেলেনস্কির সতর্কতা এশিয়াকেও
জেলেনস্কির উদ্বেগ শুধু ইউক্রেন নিয়ে নয়। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিয়ে উত্তর কোরিয়া তার ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্রের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলো আরও উন্নত করার সুযোগ পাচ্ছে বলে তার দাবি। সে কারণে ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা শুধু ইউরোপ নয়, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
ইউক্রেনের এই উদ্বেগের সঙ্গে আরেকটি বড় সমস্যা জড়িয়ে আছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কিয়েভের হাতে পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। রাশিয়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়েছে। অথচ সেগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম মার্কিন প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ আগের তুলনায় কমেছে বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি।
এবার রাশিয়ার ভেতরেও ইউক্রেনের পাল্টা আঘাত
রাশিয়ার হামলার মধ্যেই পাল্টা ড্রোন অভিযান চালিয়েছে ইউক্রেন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাশিয়ার ওরেনবুর্গ অঞ্চলের ওরস্কে একটি বড় তেল শোধনাগারে হামলার দাবি করেছে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী। যুদ্ধের সম্মুখরেখা থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে ওই স্থাপনা। স্থানীয় গভর্নর ইয়েভগেনি সোলনতসেভ সেখানে আগুন লাগার কথা স্বীকার করেছেন। তবে হতাহতের খবর নেই। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই এলাকায় আটটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
ভোরোনেঝ অঞ্চলেও ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় গভর্নরের দাবি। ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে রাশিয়ার বড় অনলাইন বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের দুটি গুদামে আগুন লাগে। একটির আগুন প্রায় ১৬ হাজার বর্গমিটার এবং অন্যটির প্রায় ২০ হাজার বর্গমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। ওয়াইল্ডবেরিজ জানিয়েছে, কর্মীদের আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে পণ্য সরবরাহ অন্য গুদামে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এর এক দিন আগেই রাশিয়ার তাতারস্তানের নিজনেকামস্ক শহরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল রুশ কর্তৃপক্ষ। ওই হামলার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে তাতনেফটের ট্যানেকো তেল শোধনাগারও ছিল। ইউক্রেন ওই তেল স্থাপনায় হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে উভয় দেশই।
এই পাল্টাপাল্টি আঘাতের মধ্যেই নতুন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কিয়েভ। ইউক্রেনের স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস সেন্টার মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে দাবি করেছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। বিশেষ করে ২৪ আগস্ট ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসের আগে রাশিয়ার কৌশলগত মজুতে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে স্বাধীনভাবে এই দাবি নিশ্চিত করা যায়নি।
মাঠের লড়াইয়েও নিজেদের অগ্রগতির দাবি করেছে মস্কো। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, খারকিভ অঞ্চলের শেরবাকিভকা এবং জাপোরিঝঝিয়ার নোভে পোলে তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এর আগে দোনেৎস্কের আরও দুটি বসতি দখলের দাবিও করেছিল রাশিয়া। কিয়েভ এসব দাবি স্বীকার করেনি এবং স্বাধীনভাবেও সেগুলো যাচাই করা যায়নি। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সম্মুখরেখায় গত কয়েক মাসে বড় ধরনের পরিবর্তন তুলনামূলক কম।
রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্ক তাই এখন শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন অধ্যায় নয়। মস্কো পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে আরও ক্ষেপণাস্ত্র ও সেনা পেলে ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে রুশ যুদ্ধক্ষেত্রে পাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রকেও আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। কিয়েভের সবচেয়ে বড় ভয় সেখানেই।
আর জেলেনস্কির বার্তাও সেই কারণেই শুধু পুতিনকে কটাক্ষ নয়। তার বক্তব্যের সারকথা, কিম জং উনের অস্ত্র যত বেশি ইউক্রেনে ব্যবহৃত হবে, তার প্রভাব একদিন ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছাতে পারে এশিয়াতেও।






