জলবায়ু পরিবর্তনে হিমালয়ে বাড়ছে মানুষ ও চিতাবাঘ সংঘাত

সংগৃহীত ছবি
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উপকণ্ঠে গত ২২ ফেব্রুয়ারি নিজের বাড়ির বারান্দায় বসেছিলেন ৬৭ বছরের কৃষক বুলাল মহার্জন। কিন্তু আচমকাই একটি মোটরসাইকেল উল্টে পড়ার শব্দে ঘুরে তাকাতেই সামনে হাজির একটি জলজ্যান্ত চিতাবাঘ। মুহূর্তের মধ্যে প্রাণীটি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কপাল ও হাতে গুরুতর জখম করে। প্রতিবেশীরা ছুটে এসে চিতাবাঘটিকে একটি বাড়ির ভিতরে আটকে ফেলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর বনদপ্তরের কর্মীরা প্রাণীটিকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। কিন্তু সেই ঘটনার আতঙ্ক এখনো তাড়া করে বেড়ায় মহার্জনকে।
এই ঘটনাই তুলে ধরেছে নেপালের নতুন বাস্তবতা। ৩১ জুলাই প্রকাশিত এক বিশদ রিপোর্টে জানানো হয়েছে যে, বনভূমির বিস্তার, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশের ফলে হিমালয় অঞ্চলে মানুষ ও চিতাবাঘের সংঘাত উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
গবেষণা বলছে ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নেপালে হাতি, গন্ডার, বাঘ ও সাধারণ চিতাবাঘের সঙ্গে সংঘাতে ৮৮৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আর ১,১৩৯টি বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ চিতাবাঘই বছরে গড়ে ১৯ জন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। যা অন্য যেকোনো বড় স্তন্যপায়ী শিকারির তুলনায় বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে গত তিন দশকে নেপালের প্রায় ৪৭ শতাংশ এলাকা বনভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর এক তৃতীয়াংশই কমিউনিটি ফরেস্ট। বন বেড়ে যাওয়ায় চিতাবাঘের আবাসস্থলও বেড়েছে। কিন্তু তাদের স্বাভাবিক শিকার কমে যাওয়ার ফলে তারা গবাদিপশু ও মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসছে। ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায় যে, মধ্য পাহাড়ি অঞ্চলের চিতাবাঘের খাদ্যের ২৭ শতাংশই গৃহপালিত পশু। অথচ বুনো হরিণ ও বুনো শূকর মিলিয়ে মাত্র ১০ শতাংশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। গবেষণায় দেখা গেছে যে, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে প্রায় এক হাজার মিটার উচ্চতার অঞ্চলগুলো চিতাবাঘের জন্য উপযোগী হয়ে উঠছে। ফলে তারা উঁচু এলাকার জনবসতিতে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, রাস্তা নির্মাণ, বনাঞ্চলে মানুষের অনুপ্রবেশ এবং অবৈধ শিকার তাদের আবাসস্থল বদলে দিতে বাধ্য করছে।
তবে শুধু নেপালই নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশও এই সমস্যার মোকাবিলায় নতুন উপায় খুঁজছে। আর্জেন্টিনায় কাঁটাযুক্ত চামড়ার কলার পরিয়ে ছাগল ও ভেড়াকে পুমার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার উদ্যোগ সফল হয়েছে। কেনিয়ায় সৌরশক্তিচালিত ঝলমলে এলইডি আলো ব্যবহার করে চিতাবাঘকে দূরে রাখা হচ্ছে। ভারতে আখক্ষেতে চিতাবাঘের গতিবিধি নজরদারিতে কৃষকদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা বা মানুষের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে বন্যপ্রাণীকে জনবসতি থেকে দূরে রাখার পরীক্ষানিরীক্ষাও চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, নিরাপদ পশুপালন, শক্তিশালী বেড়া, দ্রুত আর্থিক সহায়তা এবং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণই এই সংঘাত কমানোর কার্যকর পথ। নইলে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সাফল্যই ভবিষ্যতে মানুষের জন্য নতুন সংকটে পরিণত হবে।







