কেনিয়া কেন টাটাকে ‘টা টা’ দিতে চায়

শত বছরের পুরনো কেনিয়ার টাটা কেমিক্যালস মাগাদির সোডা অ্যাশ কারখানা। ছবি: সংগৃহীত
কেনিয়ার মাগাদি শহরের মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে সোডা অ্যাশ। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে লেক মাগাদির তীরের এই প্রত্যন্ত এলাকায় খনিজটির ব্যবসা গড়ে উঠে। ১৯১১ সাল থেকে সোডা অ্যাশের সঙ্গে এ এলাকায় এসেছে রপ্তানিমুখী শিল্প, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা।
কিন্তু স্থানীয় বেশিরভাগ মানুষের অভিযোগ, এই খনিজ সম্পদ থেকে তারা যে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, তা পাননি।
এ জায়গাতেই ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী টাটা কেমিক্যালসের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও কেনিয়া সরকারের সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কেনিয়ার সরকার জুলাইয়ে কোম্পানিটির খনন কার্যক্রম স্থগিত করেছে। পরে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো টাটা কেমিক্যালসকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে কোম্পানি ও সরকারের মধ্যে আলোচনার জন্য একটি যৌথ কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিরোধটি শুধু একটি কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বড় প্রশ্ন—এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে মাগাদি থেকে যে সম্পদ তোলা হচ্ছে, তার প্রকৃত সুবিধা কে পাচ্ছে?
এক শতাব্দীর পুরনো শিল্প
মাগাদিতে বাণিজ্যিকভাবে সোডা অ্যাশ উৎপাদন শুরু হয় ১৯১১ সালে। ২০০৫ সালে টাটা কেমিক্যালস এই কার্যক্রম কিনে নেয়। পরে এর নাম হয় টাটা কেমিক্যালস মাগাদি লিমিটেড।
কোম্পানিটি কেনিয়ার অন্যতম বড় সোডা অ্যাশ রপ্তানিকারক। উৎপাদনের বড় অংশ বিদেশের বাজারে যায়। একই সঙ্গে মাগাদির দৈনন্দিন জীবনেও কোম্পানিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো কিছু সেবাও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে টাটা কেমিক্যালসকে স্থানীয় মানুষের কাছে শুধু একটি খনন কোম্পানি হিসেবে দেখা হয় না। বহু পরিবারের জীবিকার সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এখানেই বিরোধের আরেকটি দিক আছে।
কেনিয়ার সরকার বলছে, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করার মানে এই নয় যে দেশের বর্তমান খনি আইন না মানার লাইসেন্স পেয়ে যাওয়া।
খনি বিষয়ক মন্ত্রিসচিব হাসান জোহো বলেছেন, ২০১০ সালের সংবিধান ও পরবর্তী খনি আইনের পর নিয়ন্ত্রক কাঠামো বদলেছে। সরকারের একটি বিস্তৃত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, টাটা কেমিক্যালস খনি আইনের আওতায় খনিজ অধিকার বা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেনি। বরং তারা জমির পুরনো ইজারা বা কার ছাড়ের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালাচ্ছে।
সরকারের হিসাবে, কোম্পানিটি প্রথমবার খনিজ অধিকারের জন্য আবেদন করে ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই।
জোহোর ভাষায়, অতীতের ভুল বা অবহেলা বর্তমান আইন থেকে ছাড় পাওয়ার অধিকার তৈরি করে না।
সরকারের অভিযোগ শুধু লাইসেন্স নিয়ে নয়
টাটা কেমিক্যালসের বিরুদ্ধে সরকারের প্রশ্নের পরিধি আরও বড়।
খনিজ রয়্যালটি বা রাজস্ব পরিশোধ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন চুক্তি, দেশে খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ, কেনীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় পণ্য ও সেবা কেনার মতো বিষয়ও পর্যালোচনায় এসেছে।
কাজেই বিরোধটি শুধু ‘কোম্পানির লাইসেন্স আছে কি না’— এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই।
সরকারের মূল বক্তব্য হলো, মাগাদির খনিজ থেকে কেনিয়ার আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া উচিত।
বর্তমানে সোডা অ্যাশের বড় অংশ কাঁচামাল হিসেবে বিদেশে চলে যায়। কেনিয়া চায়, দেশের ভেতরেই এর আরও বেশি প্রক্রিয়াজাতকরণ হোক। এর সঙ্গে কাচ ও রাসায়নিক শিল্প গড়ে উঠুক। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং খনিজের মূল্য সংযোজনের বড় অংশ দেশের ভেতরেই থাকবে।
প্রেসিডেন্ট রুটোও এই যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নতুন বিনিয়োগকারী এলে কাচ ও রাসায়নিক উৎপাদনের বড় কারখানা স্থাপন করতে হবে। তার লক্ষ্য, মাগাদির সম্পদ থেকে স্থানীয় জনগণ ও কেনিয়া আরও বেশি সুবিধা পাক।
তাহলে এখনই কেন
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। টাটা কেমিক্যালস মাগাদিতে এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাহলে এতদিন পর কেন এই কঠোর অবস্থান?
সরকারের ব্যাখ্যা হলো, এটি শুধু টাটার বিরুদ্ধে আলাদা কোনো পদক্ষেপ নয়। কেনিয়ার খনি খাতের পুরনো সব ইজারা ও কার্যক্রম নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে।
এ পর্যালোচনার অংশ হিসেবেই মাগাদির কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়েছে।
জুলাইয়ে খনন ও সোডা অ্যাশ রপ্তানি স্থগিত করা হয়। এরপর সরকার ও কোম্পানির মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
টাটা কেমিক্যালস অবশ্য সরকারের যে অভিযোগ তারা নিয়ম মানেনি— এমন ধারণার সঙ্গে একমত নয়।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, জুলাইয়ের স্থগিতাদেশের নোটিসে উত্থাপিত বিষয়গুলোর জবাবে তারা ১১ আগস্ট বিস্তারিত তথ্য জমা দিয়েছে। সেখানে প্রযোজ্য আইন ও বিধি মেনে চলার বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে। এরপর তারা সরকারের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।
কোম্পানিটি একই সঙ্গে বলেছে, তারা কেনিয়া সরকারের কর্তৃত্বকে সম্মান করে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে চায়।
মাগাদির মানুষ আসলে কী চায়
এখানে স্থানীয় মানুষের অবস্থান এক নয়। কেউ টাটাকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে। আবার কেউ কোম্পানিটি চলে গেলে কী হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
মাগাদির বাসিন্দা নকানোই মাতিপেই বলেছেন, স্থানীয় মানুষ আরও কর্মসংস্থান চান। শুধু সাধারণ পর্যায়ে নয়, বিভিন্ন স্তরের চাকরিও চান তারা। চান আরও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প। টাটার নিয়ন্ত্রণে থাকা অব্যবহৃত জমি গবাদিপশু চরানোর জন্য ব্যবহারের সুযোগও চান তারা।
অন্যদিকে এসথার এনগানোনি টাটাকে সরিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন।
তার কাছে টাটা কেমিক্যালস ছিল স্থানীয় মানুষের ‘জীবনরেখা’। বৃত্তি, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো সুবিধার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, টাটার জায়গায় নতুন কোনো বিনিয়োগকারী এলে স্থানীয় মানুষ কী পাবেন।
তার মতে, মাগাদির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
এখানে একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট। স্থানীয় মানুষের একাংশ টাটার কাছ থেকে আরও বেশি সুবিধা চায়। আবার অন্য অংশটি মনে করে, টাটা চলে গেলে এখন যে সামান্য সুবিধাগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও হারিয়ে যেতে পারে।
পানির সংকটই সমস্যার গভীরতা বোঝায়
মাগাদির সমস্যা শুধু কর্মসংস্থান বা রয়্যালটি নিয়ে নয়। মৌলিক সেবার ঘাটতিও বড় বিষয়।
কাজাজিও ওয়েস্টের সাবকাউন্টির সাবেক শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা কসমাস কারেরা কিরাতু বলেছেন, এলাকায় দারিদ্র্য, পানির সংকট, স্কুলে যাওয়ার দীর্ঘ পথ, অবকাঠামোর ঘাটতি ও শিক্ষক সংকট রয়েছে।
শিশুশ্রম, কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ, নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতি এবং বাল্যবিবাহের মতো সমস্যার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
কিছু স্কুলের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। পানির সংকটও তীব্র।
কারেরার ভাষ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনের মাধ্যমে পাওয়া একমাত্র বিশুদ্ধ পানি প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের এনগুরুমানি থেকে টাটা কেমিক্যালসের কাছে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দারা কোম্পানির পানিবাহী গাড়ির ওপরও নির্ভরশীল। কিন্তু এসব গাড়ি সব এলাকায় পৌঁছায় না। গৃহস্থালি ও গবাদিপশু—দুই প্রয়োজন মেটানোর জন্যও অনেক সময় পানি যথেষ্ট হয় না।
অর্থাৎ, টাটা কেমিক্যালস স্থানীয় মানুষের জন্য একদিকে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে এই নির্ভরশীলতাই এখন বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কোম্পানি চলে গেলে বিকল্প পানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা কে করবে— এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই।
সরকার কী চায়
এই প্রশ্নের উত্তর তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার। সরকার চায়, মাগাদির খনিজ সম্পদ থেকে কেনিয়া আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য পাবে।
যৌথ কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে এই বিষয়গুলো সমাধানের জন্য। কমিটির আলোচনায় রয়েছে স্থানীয় উন্নয়ন চুক্তি, খনিজ রয়্যালটি, দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ, কেনিয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান, স্থানীয় পণ্য ও সেবা কেনা এবং কাজাজিও কাউন্টি সরকারের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়।
এ ছাড়া খনিজের মূল্য সংযোজন, স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলা, জমি নিয়ে বিরোধ এবং একাধিক কোম্পানিকে খনন কার্যক্রমে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
কাজাজিওর গভর্নর জোসেফ ওলে লেনকু চান, আলোচনায় কাউন্টি সরকারকে অবশ্যই রাখা হোক।
তার অন্যতম দাবি হলো, বকেয়া ভূমি কর পরিশোধ করতে হবে।
অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় সরকার, কাউন্টি সরকার, কোম্পানি ও স্থানীয় জনগণ— সবার স্বার্থ এখন একই আলোচনার টেবিলে এসেছে।
টাটার জায়গায় নতুন কোম্পানি এলেই কি সমস্যার সমাধান হবে
এখানেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। রুটো বলেছেন, নতুন বিনিয়োগকারী আনা হবে। শুধু সোডা অ্যাশ রপ্তানি নয়, কাচ ও রাসায়নিক শিল্পও গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ভেতরে খনিজের মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু একটি কোম্পানি বদলালেই মাগাদির দীর্ঘদিনের সমস্যা শেষ হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
কারণ সমস্যাটি শুধু বিনিয়োগকারী কে, তা নিয়ে নয়।
প্রশ্ন হলো, খনিজ সম্পদ থেকে স্থানীয় মানুষ কতটা আয় ও সুযোগ পাচ্ছে। কতটা কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। পানি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে। আর খনিজ থেকে অর্জিত অর্থের কতটা স্থানীয় অর্থনীতিতে থেকে যাচ্ছে।
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর না বদলালে কোম্পানি বদলালেও স্থানীয় অসন্তোষ থেকে যেতে পারে।
তিন পক্ষের তিন ধরনের দাবি
সরকার বলছে, আইন মানতে হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক লাভ বাড়াতে হবে।
টাটা কেমিক্যালস বলছে, তারা সরকারের উত্থাপিত বিষয়গুলোর জবাব দিয়েছে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চায়।
স্থানীয় মানুষের অবস্থান আরও জটিল। তারা টাটার কাছ থেকে আরও চাকরি, আরও উন্নয়ন ও আরও সুযোগ চায়। কিন্তু একই সঙ্গে অনেকেই ভয় পাচ্ছেন, কোম্পানি চলে গেলে পানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো যেসব সুবিধা এখন পাওয়া যায়, সেগুলোও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ফলে মাগাদির প্রশ্নটি শুধু ‘টাটা থাকবে কি থাকবে না’— এখানে থেমে নেই।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে যে সম্পদ এই অঞ্চলের অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে আছে, তার সুফল কীভাবে আরও ন্যায্যভাবে ভাগ হবে।
নকানোই মাতিপেইয়ের কথায় এই দ্বন্দ্বটি সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। তার মতে, বছরের পর বছর কোম্পানির সহায়তা স্থানীয় মানুষকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেই সহায়তা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে দেয়নি।
মাগাদির ভবিষ্যৎ তাই এখন শুধু টাটা কেমিক্যালসের ভবিষ্যৎ নয়। এটি কেনিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় মানুষের অধিকার এবং বিদেশি বিনিয়োগ থেকে দেশের প্রকৃত লাভ— এই তিনটি প্রশ্নেরও পরীক্ষা।
সূত্র: আল জাজিরা








